আমাদের শঙ্কা ছিল কখন ভেসে আসে দুঃসংবাদ। অসংখ্য মানুষের শুভকামনা ছিল তাকে ঘিরে, তিনি যেন আরোগ্য লাভ করে দ্রুত ফিরে আসেন আবার জনগণের মাঝে। কিন্তু সবাইকে বেদনাকাতর করে তিনি ৩০ নভেম্বর রাতে লন্ডনে চিকিৎসারত অবস্থায় চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জনবান্ধব মেয়র আনিসুল হক যুক্তরাজ্যের লন্ডনের দ্য ওয়েলিংটন হাসপাতালে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্র দেওয়া অবস্থায় ছিলেন। ৩০ নভেম্বর রাত ১০টা ২৩ মিনিটে এই যন্ত্র খুলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করলে ৬৬ বছরের এক বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান ঘটে।
বর্ণাঢ্য জীবনাধিকারী আনিসুল হক ব্যবসায়ী থেকে ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল মেয়র নির্বাচনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে জয়লাভ করেন। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, টেলিভিশন উপস্থাপক আনিসুল হক জনবান্ধব রাজনৈতিক নেতা হিসেবে শুরু করেন নবযাত্রা। মোহাম্মদী গ্রুপের চেয়ারম্যান আনিসুল হক একজন সফল ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা হিসেবে জ্বালানি খাত, তথ্যপ্রযুক্তি ও গণমাধ্যম খাতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছিলেন পোশাক মালিকদের সংগঠন তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির নির্বাচিত সভাপতি (২০০৫-০৬)। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি (২০০৮-১০)। সার্কভুক্ত দেশগুলোর ব্যবসায়ীদের সংগঠন সার্ক চেম্বার অব কমার্সের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন (২০১০-১২)।
মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি বেশ কিছু সাহসী ও জনবান্ধব পদক্ষেপ নেন। এর মধ্যে তেজগাঁও ট্রাক টার্মিনালের সামনের সড়ক দখলমুক্তকরণ, গুলশান-বনানী-বারিধারা-নিকেতন এলাকায় বিশেষ রঙের রিকশা এবং ‘ঢাকা চাকা’ নামে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস সেবা চালুকরণ, উত্তর ঢাকায় যানজট নিরসনে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ, মহাখালী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কে ইউলুপ করার উদ্যোগ নেন। ‘সবুজ ঢাকা’ নামের বিশেষ সবুজায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করে নাগরিক মহলে প্রশংসিত হন। এ ছাড়া ঢাকার দখলকৃত খালগুলো উদ্ধারে নিয়েছিলেন বিশেষ উদ্যোগ। তিনি স্বপ্ন সারথিরূপে নগরবাসীর সামনে নিজেকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
নিজের ব্যর্থতা তিনি স্বীকার করে নিতেন অকপটে। সিটি করপোরেশনের দুর্নীতি বন্ধে তিনি ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। তিনি যেন ক্রমেই হয়ে উঠছিলেন নক্ষত্রের মতো। প্রকৃতই তিনি ছিলেন একজন আধুনিক মানুষ। সর্বদা হাস্যোজ্জ্বল মুখের এই স্বপ্নবান জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখিয়েছেন সাফল্য। আশির দশকে টেলিভিশনে (বিটিভি) চৌকস উপস্থাপনার মাধ্যমে দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, জনপ্রতিনিধি হিসেবেও অর্পিত দায়িত্ব পালনে দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে অল্পদিনে ঠাঁই করে নিয়েছেন নগরবাসীর হৃৎপিণ্ডে। নানামুখী কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত রেখে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নাগরিক সমাজের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা একজন কর্মনিষ্ঠ, বিনয়ী মানুষ হিসেবে সর্বমহলে সমাদৃত ছিলেন তিনি। পরিবর্তনের গতিশীল রূপকার আনিসুল হক সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পাননি কখনোই।
চিরকাল প্রসন্ন থাকাটা একজন মানুষের পক্ষে খুব দুরূহ। কিন্তু তাকে কখনোই অপ্রসন্ন দেখা যায়নি। আর এ জন্যই হয়তো সার্বক্ষণিক কর্মধারার প্রয়োজনীয় প্রাণশক্তিরও কোনো কমতি ছিল না তার মধ্যে। মেধা ও পরিশ্রমের সঙ্গে এক অসাধারণ যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছিল তার কর্মক্ষেত্রে, যে যোগসূত্র দিয়ে তিনি সব কর্মকাণ্ডের স্রোতধারাকেই বেগবান করেছিলেন। তিনি শারীরিকভাবে নেই- এ সত্য মেনে নিতে আমাদের কষ্ট হচ্ছে, কষ্ট হবেও অনেক অনেক দিন; কিন্তু তারপরও আমরা শক্তি সঞ্চয় করে শোক কাটিয়ে উঠব, আমাদের জন্য রেখে যাওয়া তার কর্ম ও সৃষ্টির দিকে আরও বেশি করে ঝুঁকে। নিত্য ফসলি জমিন ও আনিসুল হক যেন সমান্তরাল। কিন্তু সবচেয়ে বড় নির্দিষ্ট কিছু জায়গায়, যেমন সততায়-নিষ্ঠায়-একাগ্রতায়-প্রতিজ্ঞায়-পেশাদারিত্বের স্তম্ভগুলো নির্মাণ ও যত্নে ছিলেন তিনি অবিচল। শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তার মাঝে ব্যর্থতা খুঁজে পাওয়া ভার। সীমাবদ্ধতার ভেতরও তিনি সম্পূর্ণ সফল। কাজের ক্ষেত্রে যেমন, মানুষ হিসেবেও তেমনই। অগ্নিদগ্ধ বনবৃক্ষ পুড়ে হয় কয়লা। সেই কয়লা পুড়ে নিস্কাশিত হয় নিগূঢ়তম অনুপম হীরকখণ্ড। অবিনশ্বর হীরককে আর পোড়ানো যায় না। যে অনিবার্য সত্য অসময়ে আনিসুল হকের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিল, তা বেদনার। তার সময় তো ঢের বাকি ছিল। তার চিরপ্রস্থানে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হলাম। তার স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক: সাংবাদিক
deba_bishnu@yahoo.com

