ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আনিসুল হকের নিজের নামে কোনো বাড়ি-গাড়ি নেই। তাঁর চেয়ে স্ত্রী রুবানা হকের আয় বেশি। আওয়ামী লীগ সমর্থিত এই ব্যবসায়ী নেতা নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় এমন তথ্য দিয়েছেন। তাঁর নামে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই।

 

শিক্ষাগত যোগ্যতা এমএসএস। অন্যদিকে বিএনপির ব্যবসায়ী নেতা আব্দুল আওয়াল মিন্টুর বিরুদ্ধে রয়েছে নাশকতাসহ ১৩টি মামলা। আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী আব্দুল আওয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়াল ১৭টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত।

 

আনিসুল হক : আনিসুল হকের হলফনামায় দেওয়া তথ্য মতে, তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও কারো কোনো গাড়ি নেই। হলফনামায় বাস, ট্রাক, মোটরগাড়ি, লঞ্চ, স্টিমার, বিমান, মোটরসাইকেল ইত্যাদির বিবরণী লেখার ঘরটি রেখা টেনে শূন্য রাখা হয়েছে। বিভিন্ন খাত থেকে তাঁর চেয়ে স্ত্রীর বাৎসরিক আয় বেশি। স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে মোট সম্পত্তি প্রায় সাড়ে ২৬ কোটি টাকার। এর মধ্যে নগদ অর্থ এক কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

আনিসুল হক মোট ২২টি ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। তাঁর অস্থাবর সম্পত্তি ২৩ কোটি টাকার। এর মধ্যে নগদ অর্থ এক কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এফডিআর (স্থায়ী আমানত) হিসেবে বিনিয়োগ রয়েছে তিন কোটি ৫৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। বন্ড, ঋণপত্র ও শেয়ার রয়েছে ১১ কোটি ৪৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকার। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা করা অর্থ ছয় লাখ ৫৮ হাজার টাকা। স্বর্ণ, মূল্যবান ধাতু ও অলংকার রয়েছে ১১ লাখ ১২ হাজার টাকার। ‘অন্যান্য (ঋণ প্রদান)’ হিসেবে পাঁচ কোটি ৩৬ লাখ ৮৩ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে তাঁর। আর তাঁর আসবাব রয়েছে ১৪ লাখ ২৪ হাজার টাকার।

আনিসুল হকের স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে সাড়ে তিন কোটি টাকার। তাঁর বার্ষিক আয় ৭৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৪৫ লাখ ৮৯ হাজার টাকা আসে এফডিআরের মুনাফা থেকে, ব্যবসায় পারিতোষিক হিসেবে পান ২৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা, ‘বাড়ি/অ্যাপার্টমেন্ট/দোকান বা অন্যান্য ভাড়া’ থেকে তাঁর বার্ষিক আয় দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা। বাকি আয় আসে শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানত থেকে। তাঁর স্থাবর সম্পদ (অকৃষি জমি) তিন কোটি ৫৭ লাখ ৬৮ হাজার টাকা।

আনিসুল হকের চেয়ে স্ত্রী রুবানা হকের বার্ষিক আয় ৯ কোটি টাকার বেশি। হলফনামায় দেখা যায়, রুবানা হকের বার্ষিক আয় ৮৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। আনিসুল হকের ‘ওপর নির্ভরশীল’ স্ত্রী ব্যবসার পারিতোষিক পান স্বামীর সমান। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ২৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা। এফডিআর থেকে রুবানার আয় ৪০ লাখ ৪৪ হাজার টাকা, বাড়িভাড়া থেকে ১৮ লাখ, বাকি আয় আসে শেয়ার ও সঞ্চয়পত্র থেকে।

রুবানা হকের অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ পাঁচ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে নগদ অর্থ ৩৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা অর্থ ২৮ লাখ ২৪ হাজার টাকা। স্থায়ী আমানত চার কোটি ২৫ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। অলংকার ৫০ হাজার টাকা, আসবাব ২০ হাজার টাকার। তাঁর স্থাবর সম্পদ রয়েছে (বাড়ি/অ্যাপার্টমেন্ট) ৭০ লাখ ৬১ হাজার টাকার।

বিভিন্ন ব্যাংক থেকে আনিসুল হকের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ১৬৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা, যা তাঁর মোট স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের চেয়ে বেশি। এ ছাড়া আনিসুল হকের দায়দেনা রয়েছে পাঁচ কোটি ২৯ লাখ ৪৭ হাজার টাকা।

আবদুল আউয়াল মিন্টু : আবদুল আউয়াল মিন্টুর বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই নাশকতার। এর মধ্যে পাঁচটিতে তিনি জামিনে রয়েছেন। নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হলফনামায় মিন্টু এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, এর আগের তিনটি মামলার মধ্যে দুটিতে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। আর একটির কার্যক্রম উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে।

হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিন্টু ১৪টি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও বিভিন্ন পদে রয়েছেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘এমএসসি’। তাঁর নিজের নামে আট লাখ ৫০ হাজার টাকার এবং স্ত্রীর নামে ৯ লাখ ৮৩ হাজার ৬৬২ টাকার যানবাহন রয়েছে।

তাঁর বার্ষিক আয় পাঁচ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে কৃষি থেকে তিন কোটি ৫০ লাখ টাকা, বাড়ি-অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া থেকে ৯ লাখ চার হাজার টাকা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে পারিতোষিক খাতে ৯৩ লাখ টাকা, শেয়ারে ২৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা, নিজের পেশা থেকে বার্ষিক দুই লাখ ৭২ হাজার টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৩৮ লাখ ৩৭ হাজার টাকা আয়ের কথা বলা হয়েছে।

মিন্টু নিজের নামে ৫৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং স্ত্রীর নামে আট কোটি ৩৬ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ থাকার কথা বলেছেন। এ ছাড়া তাঁর নিজের নামে রয়েছে চার কোটি ৫০ লাখ টাকার কৃষি-অকৃষি জমি, স্ত্রীর নামে রয়েছে ৫০ লাখ টাকার অকৃষি জমি এবং যৌথ মালিকানায় ৬১ লাখ টাকার বাড়ি। তাঁর অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে নগদ টাকা আট লাখ ৫০ হাজার টাকা, ব্যাংকে জমা ৬৮ লাখ ৮৯ হাজার টাকা এবং বন্ড ও কম্পানির শেয়ার মিলিয়ে আছে ৪০ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।

হলফনামায় মিন্টু জানান, বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে তাঁর ঋণের পরিমাণ ২২৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। আর বিভিন্ন খাতে তাঁর দায়ের পরিমাণ ছয় কোটি টাকা।

তাবিথ আউয়াল : উত্তরে আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়ালও শেষ মুহূর্তে মেয়র প্রার্থী হয়েছেন। তবে তিনি বাবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। মাল্টিমোড গ্রুপের উপপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাবিথ আউয়ালের নামে কোনো মামলা নেই। তিনি নিজেই ১৭টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। হলফনামায় তিনি নিজের বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন প্রায় সোয়া কোটি টাকা। আর তাঁর অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে বন্ড ও শেয়ার রয়েছে ১৪ কোটি ৮১ লাখ টাকার। অন্যান্য খাতে রয়েছে আরো ১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকার সম্পদ।

কবরী : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়ন দাখিলকারী আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও চলচ্চিত্র নায়িকা সারাহ্ বেগম কবরীর বছরে আয় ১৯ লাখ ৮০ হাজার ২৪৮ টাকা। তাঁর নগদ ও ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা, আরএফসি, একটি প্রাডো জিপ, অলংকার ও আসবাবপত্র মিলিয়ে এক কোটি ৫৭ লাখ ৮৭ হাজার ৯৪৫ টাকার সম্পদ রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে গুলশান-২-এ একটি ছয়তলা বাড়ি।

ববি হাজ্জাজ : জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের সাবেক উপদেষ্টা ও দেশের আলোচিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের ছেলে ববি হাজ্জাজের নগদ টাকার পরিমাণ ৬০ হাজার টাকা। এ ছাড়া পাঁচ হাজার ৯৮৯ ডলার রয়েছে তাঁর।

মাহী বি চৌধুরী : সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ছেলে মাহী বি চৌধুরীর বছরে আয় ৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ব্যবসা ও শেয়ার/সঞ্চয়পত্র/ব্যাংক আমানত থেকে এ আয়। অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে নগদ টাকা রয়েছে এক লাখ ও স্ত্রীর ৫০ হাজার টাকা। ব্যাংকে জমা রয়েছে নিজের এক লাখ ও স্ত্রীর প্রায় দুই লাখ টাকা। শেয়ার ৫০ হাজার টাকার। ১৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা মূল্যের একটি নিশান জিপ রয়েছে। স্ত্রীর বিয়ের সময় পাওয়া ৪৫ হাজার টাকার অলংকার আছে। এ ছাড়া ইলেকট্রনিক সামগ্রী রয়েছে এক লাখ টাকার। স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে সাভারে ৩১ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকার জমি। অন্যদিকে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ২৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ঋণ রয়েছে।

চৌধুরী ইরাদ আহমেদ সিদ্দিকী : বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকীর ছেলে চৌধুরী ইরাদ আহমেদ সিদ্দিকীর বছরে আয় ১০ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে নগদ টাকা ২৫ হাজার, ব্যাংকে ২৫ হাজার, টিভি, কম্পিউটার, টুইন-ওয়ান (মূল্য উল্লেখ করা হয়নি) এবং আসবাবপত্র (মূল্য উল্লেখ করা হয়নি)। স্ত্রীর রয়েছে ৪০ ভরি স্বর্ণ। বর্তমানে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই। আগে দ.বি. ৫০০ ধারায় মামলা ছিল তা হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত রয়েছে।

View Source PDF