মুহাম্মদ নঈমুদ্দিন : ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন আজ দায়িত্ব নেবেন। সকাল ৯টায় শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে তাদের কার্যক্রম।
দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নই দুই নগরপিতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তারা প্রথম দিন থেকেই ঢাকা মহানগরীতে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করাসহ নির্বাচনী এশতেহার বাস্তবায়নে মাঠে নামবেন, এমনটাই প্রত্যাশা নগরবাসীর।
নতুন মেয়রদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জলাবদ্ধতা, যানজট, মশা-মাছির উৎপাত ও সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি, শব্দ দূষণ, বর্জ ব্যবস্থাপনা, পানি ও গ্যাস সমস্যা সমাধান করতে হবে। বিশেষ করে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়, আর্থিক সঙ্কট দূর করে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বেহাত হয়ে যাওয়া ডিসিসির সম্পত্তি উদ্ধার, কমন ইউটিলিটি টানেল নির্মাণ, রাস্তাঘাটসহ ভৌত অবকাঠামো ঠিক করা, খেলার মাঠ ও পার্ক দখলমুক্ত করাও তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে ।
দক্ষিণ সিটির বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘প্রায় দুই কোটি মানুষের আবাস এই ঢাকা এখন অন্তহীন সমস্যায় জর্জরিত। এখানে নেই পর্যাপ্ত নাগরিক সুযোগ-সুবিধা। যানজট, জলাবদ্ধতা, মশা-মাছির উৎপাত, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি, শব্দ দূষণ, যত্রতত্র বর্জ, অস্বাস্থ্যকর ও দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ, বিশুদ্ধ খাবার পানি সঙ্কট, গ্যাস সমস্যা নিয়েই নগরবাসীর জীবনযাপন। অবস্থা এমন হয়েছে যে, এই শহর ছেড়ে পালাতে পারলেই যেন সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। অন্তহীন এসব সমস্যা সমাধানে এতদিন কোনো অভিভাবক ছিল না। এখন দুজন মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পর্যায়ক্রমে সব সমস্যা সমাধান করবেন। আশা করি, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নির্বাচিত দুই মেয়র অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান করে নগরবাসীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন।’
তবে সিটি মেয়রদের পক্ষে একা একা ইশতেহার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। প্রতিশ্রুতি পূরণে সরকারের ২০টি মন্ত্রণালয় ও ৫২টি অধিদপ্তরের ওপর দুই মেয়রকে নির্ভর করতে হবে। এসব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করা সত্যিকার অর্থে দুই নগরপিতার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তারপরও নগরবাসীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হলে মেয়রদের চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। তবে সরকারি দলের সমর্থন থাকায় ইশতেহার বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন মেয়ররা অনেকখানি সফল হবেন বলেও নগরবাসীর ধারণা।
সিটি নির্বাচনের আগে আনিসুল হক তার নির্বাচনী ইশতেহারে ঢাকাকে ‘পরিচ্ছন্ন-সবুজ-আলোকিত ও মানবিক শহর’ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গিকার করেছিলেন। বিজয়ী হলে আগে পাঁচটি কাজে হাত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আনিসুল হক। এসব হলো পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও আলোকিত ঢাকা গড়া, শিশুদের স্কুল তৈরি ও দরিদ্রদের কর্মসংস্থান তৈরি করা।
তিনি বলেছিলেন, ‘মেয়রের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথমেই রাজধানীকে ‘পরিচ্ছন্ন’ করার মধ্য দিয়ে তিনি কাজ শুরু করতে চান। বর্তমানে রাজধানী ঢাকার বড় সমস্যা অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। আন্তরিকতা না থাকলে এ কাজটি করা আসলে সহজ নয়। পরিচ্ছন্ন নগরী ঢাকা গড়ে তোলা আনিসুলের জন্য শুরু থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ মনে করেন নগরবাসী। বুধবার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে তিনি কী কী পদক্ষেপ নেবেন, এটাই এখন দেখার বিষয়। শুধু তাই নয়, ঢাকা মহানগরীকে সবুজ নগরীতে পরিণত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন তিনি। এ ছাড়া নগরবাসীকে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি তিনি বসবাসের অযোগ্য নগরীর বদনাম ঘোচাতে চান। রাতের ঢাকাকে আলোকিত ও দৃষ্টিনন্দন করাও তার অন্যতম প্রতিশ্রুতি। প্রকৃতপক্ষে সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে এসব সমস্যা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করা কঠিন হলেও নতুন মেয়রের দিকে তাকিয়ে আছেন নগরবাসী।
জানা গেছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সিটির সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি নগরভবনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা উত্তর সিটি মেয়র আনিসুলের জন্য চ্যালেঞ্জিং কাজই হবে। কারণ নগরভবনের অধিকাংশ কর্মকা-ে এখনো দলের অনুগত নেতা-কর্মীদের হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। এ জন্যই নির্বাচনের আগে আনিসুল হক নির্বাচিত হলে নগরবাসীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত নগরভবন উপহার দেওয়ার কথা দিয়েছিলেন।
উত্তর সিটির মেয়র আনিসুল হকের মতোই দক্ষিণ সিটির নব নির্বাচিত মেয়র সাঈদ খোকনের জন্যও নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তারপরও তিনি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তার প্রতিশ্রুতি শতভাগ পূরণ করতে চান। নির্বাচনের আগে তিনি বলেছিলেন, ‘বিজয়ী হলে ঢাকাকে যানজট ও দূষণমুক্ত, বুড়িগঙ্গাকে নাব্য ও নিরাপদ, পানি-গ্যাস-বিদুৎ সেবা নিশ্চিত এবং দুর্নীতি-সন্ত্রাস-চাঁদাবাজিমুক্ত নিরাপদ নাগরিক জীবন নিশ্চিত করা হবে।’ এখন তিনি মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। শপথ গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই খোকনকে এসব বিষয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
আওয়ামী লীগ সমর্থিত দক্ষিণ সিটির এ নির্বাচিত মেয়র নির্বাচনের আগে ১২ এপ্রিল নগরবাসীকে ১৫টি প্রতিশ্রুতি দিয়ে ‘নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন। এর মধ্যে প্রথম প্রতিশ্রুতি ছিল ঢাকা মহানগরীকে যানজটমুক্ত করা। এ কাজটি কঠিন হলেও দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে যানজটের বিষয়টি নগরবাসীর সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে হাজারীবাগের ট্যানারি কারখানাগুলো স্থানান্তর করাসহ বুড়িগঙ্গার যৌবন ফিরিয়ে আনাও তার জন্য একেবারেই সহজ হবে না বলে মনে করেন নগরবাসী।
মেয়র খোকন বলেন, ‘আমার বাবা মরহুম মোহাম্মদ হানিফ নগরবাসীর জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমিও বাবার পথ অনুসরণ করে নগরবাসীর জন্য জীবন উৎসর্গ করতে চাই। চ্যালেঞ্জ হলেও সবার সহযোগিতা নিয়ে আমি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টা করব।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমার প্রথম কাজ হলো ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করা। এর পরই ঢাকাকে বিশ্বমানের নগরী করার চেষ্টা থাকবে। বিশ্বের সব উন্নত সিটির মতোই নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা আমার অঙ্গিকার।’
বুধবার সকাল ৯টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে নবনির্বাচিত মেয়রদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর কাউন্সিলদের শপথ করাবেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
ঢাকা উত্তরে সাধারণ কাউন্সিলর ৩৬ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ১২ জন। দক্ষিণে সাধারণ কাউন্সিলর ৫৭ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ১৯ জন।
২০১১ সালের নভেম্বরে ঢাকা সিটি করপোরেশন দুই ভাগ করে গঠিত হয় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। সেই থেকে দুই সিটি করপোরেশনই মেয়রশূন্য ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে রুটিন ওয়ার্ক ছাড়া সিটি করপোরেশন তেমন কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেয়নি। নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল উভয় সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম। ওয়ার্ড কার্যালয়গুলোও ছিল জনপ্রতিনিধিশূন্য। গত ২৮ এপ্রিল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে উত্তরে আনিসুল হক এবং দক্ষিণে সাঈদ খোকন মেয়র নির্বাচিত হন।

