রাজনীতির অঙ্গনে ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব হয়েছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের। রাজনীতিতে আসার আগে বরেণ্য এই মানুষটি পরিচিত ছিলেন সফল একজন ব্যবসায়ী হিসেবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপস্থাপক ও সঞ্চালক হিসেবে সুখ্যাতি ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে পাস করা এই নেতার। ঢাকাকে বিশ্বমানের নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে তাঁর নেওয়া বেশ কিছু উদ্যোগ এরই মধ্যে বাস্তবায়ন করতে সমর্থ হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন।

তবে আনিসুল হক মারা যাওয়ার পর নেতৃত্বের অভাবে অধিকাংশ প্রকল্পই এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

রাজধানীবাসীর অভিযোগ সরাসরি শুনতে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘নগর’ নামে একটি অ্যানড্রয়েড অ্যাপ চালু করেন আনিসুল হক। ২০১৬ সালের ২ আগস্ট উদ্বোধন করা হয় অ্যাপটি। এটি চালু হওয়ার পর ব্যাপক সাড়া মেলে তরুণদের কাছ থেকে। তাঁর অনুপস্থিতিতে সেবাটি বর্তমানে আর চালু নেই। স্পন্সরের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে অ্যাপটি।

বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় সস্তায় খাবার কিনে পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটানোর জন্য ফুড কোর্টের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন মেয়র আনিসুল হক। অযত্ন-অবহেলায় তাঁর স্বপ্নের ‘ফুড কোর্ট’ এখন মাদকাসক্তদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। যে জায়গাটি নগরবাসীর কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠার কথা ছিল, সেখানে এখন বসে জুয়ার আসর, নেশাখোরদের আড্ডা।

প্রায় এক বছর আগে নির্মাণকাজ শেষ হলেও ফুড কোর্টটি চালু করতে উদ্যোগ নেয়নি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগ। অদৃশ্য কারণে ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগ থেকে ফুড কোর্টটি বুঝে নিয়ে চালুর উদ্যোগ নেয়নি সংস্থাটির সম্পত্তি বিভাগ।

ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সম্পত্তি বিভাগ এখনো ফুড কোর্টটি বুঝে পায়নি। এ ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা বলেন। ’

রাজধানীর ভয়াবহ যানজট নিরসন এবং গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ছয়টি কম্পানির মাধ্যমে চার হাজার বাস নামানোর পরিকল্পনা ছিল তাঁর। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের এ প্রকল্প বাস্তবায়নেও উদ্যোগ নেয়নি উত্তর সিটি করপোরেশন। রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর গত ৮ সেপ্টেম্বর আনিসুল হকের প্রস্তাবনাগুলো আমলে নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে রূপরেখা তৈরি করতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনকে প্রধান করে সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র জামাল মোস্তফাকে। যানজট নিরসন এবং গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে দুই বছর সময় চায় কমিটি।

রাজধানীর ফুটপাত ও ফুট ওভারব্রিজ নারী-শিশু-প্রতিবন্ধীবান্ধব করার ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রয়াত এই মেয়র। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে দুটি ফুট ওভারব্রিজে চলমান সিঁড়ি বসানো হয়েছে। কিন্তু বাকিগুলো আগের মতোই রয়েছে। আর ফুটপাত প্রতিবন্ধীদের ব্যবহার উপযোগী করতে কাজ অব্যাহত থাকলেও হকারমুক্ত করা যায়নি এখনো।

ট্রাক মালিকদের দখলে থাকা তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তার সড়কটি উদ্ধারের পর বহুতল ট্রাকস্ট্যান্ড করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন আনিসুল হক। কিন্তু জমি না পাওয়ায় সে উদ্যোগও বাস্তবায়ন করা যায়নি। এ কারণে এখনো ওই সড়কে ট্রাক পার্ক করানো হয়।

এ ছাড়া রাজধানীর ব্যস্ততম কারওয়ান বাজারের কাঁচাবাজার বিকেন্দ্রীকরণ করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন প্রয়াত এই মেয়র। কাঁচাবাজার স্থানান্তর করে ঢাকার যাত্রাবাড়ী, মহাখালী ও আমিনবাজারে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। এই তিনটি জায়গায় এরই মধ্যে কাঁচাবাজার নির্মাণ করেছে সিটি করপোরেশন। তবে কিছু অবকাঠামো ও নীতিগত সমস্যার কারণে উদ্যোগটি এখনো বাস্তবায়ন করা যায়নি বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘ট্রাকস্ট্যান্ড নির্মাণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে জমি চাওয়া হয়েছে। আর কারওয়ান বাজার স্থানান্তরের জন্য ইতিমধ্যে তিনটি মার্কেট করা হয়েছে। কিন্তু কিছু জটিলতার কারণে তা এখনো বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। ’

প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের এসব উদ্যোগের বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেজবাউল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ট্রাকস্ট্যান্ড নির্মাণ, কারওয়ান বাজারের কাঁচাবাজার স্থানান্তরের কাজ চলমান আছে। প্রয়াত মেয়রের অন্য উদ্যোগগুলোও বাস্তবায়নে কাজ অব্যাহত রয়েছে। ’

এ ব্যাপারে মন্তব্য নেওয়ার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র জামাল মোস্তফাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

মেয়র আনিসুল হকে ছেলে নাভিদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাবার যেসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের পর মানুষ উপকার পেয়েছে, তা দেখলে বেশ ভালো লাগে। নগরবাসীকে নিয়ে তিনি সব সময় চিন্তা করতেন। তবে যেসব কাজ বাস্তবায়নের পর এখন আর সচল নেই, তা দেখলে মন খারাপ হয়। ’

View Source PDF