তিন সিটি করপোরেশনের মেয়ররা দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পার হয়েছে। এর মধ্যে কঠোর অবস্থান নিয়ে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক। একদিকে তিনি রাস্তা ঘাটের উন্নয়ন অন্যদিকে মাঠে নেমেছেন সড়ক উদ্ধারে। পাশাপাশি বাকি দুই মেয়রকে নিয়েও নগরীতে চলছে আলোচনা। মানুষ দৃশ্যমান কাজ দেখতে চায়। এ নিয়ে আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি রিয়াজ হায়দার, নিজস্ব প্রতিবেদক রফিকুল ইসলাম রনি ও লাকমিনা জেসমিন সোমা কথা বলেছেন তিন মেয়রের সঙ্গে। পাশাপাশি মতামত নিয়েছেন স্থপতি মোবাশ্বের হোসেনের।
‘নগরীর উন্নয়নে আমরা খুব একটা খারাপ করছি না। বাকিটা মূল্যায়ন করবে নগরবাসী।’দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পর নিজের কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে এমনটিই বললেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক। গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাত্কারে তিনি আরও বলেন, মেয়র কখনো একা কাজ করতে পারেন না। তার পেছনে রাজনৈতিক শক্তি লাগে। কাউন্সিলরসহ সংস্থার সবার অংশগ্রহণ লাগে। সর্বোপরি সহযোগিতা লাগে নগরবাসীর। আর তাই বলব, গত ছয় মাসে যা কিছু করতে পেরেছি তার সবটুকুই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও তার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-এমপিদের সহযোগিতা এবং ডিএনসিসির সব কাউন্সিলর, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শুভানুধ্যায়ীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে। এখন নগরবাসীই বলবে, আমরা কতখানি কী করতে পেরেছি। তিনি গত ছয় মাসের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অগ্রগতি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা নিয়ে তার অসহায়ত্ব ও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা জানান। আনিসুল হক বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো, আমরা প্রায় ২০-৩০ বছরের পুরনো কিছু সমস্যার সমাধান করতে পেরেছি। তেজগাঁওয়ের রাস্তা থেকে অবৈধ দোকানপাট, পার্কিং এবং ট্রাকস্ট্যান্ড সরিয়ে রাস্তাটিকে জনগণের কল্যাণে উন্মুক্ত করতে পেরেছি। একইভাবে মহাখালী, কারওয়ানবাজার এবং মোহাম্মদপুরেও অবৈধ যানবাহন স্ট্যান্ড সরিয়ে ওইসব এলাকা যানজটমুক্ত করতে পেরেছি। যুগ যুগ ধরে দখলে থাকা এসব রাস্তাকে উন্মুক্ত করতে আমাদের কম বেগ পেতে হয়নি, যেটি সবাই স্বচক্ষে দেখেছেন। এখন ওইসব এলাকায় নির্দিষ্ট স্থানে গাড়ি পার্কিং করা হচ্ছে। খুব শিগগিরই গাবতলী ও কল্যাণপুরেও এমন একটি পরিবর্তন আনা হবে। মেয়র বলেন, আজ ঢাকাবাসীর সবচেয়ে দুঃসহ যন্ত্রণার নাম যানজট। এটি নিরসনে রাজধানীর জয়দেবপুর চৌরাস্তা-সংলগ্ন তেলিপাড়া থেকে তেজগাঁও সাতরাস্তা মোড় পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার রাস্তায় ২২টি ‘ইউলুপ’ তৈরির মাস্টারপ্ল্যান হাতে নিয়েছি। ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি চালু করে দারুণ ফল পেয়েছি। চার মাস ধরে ইঞ্চি-ইঞ্চি জমি মেপে এই পরিকল্পনা কাঠামো দাঁড় করিয়েছি। আশা করছি জুনের মধ্যে এটি হয়ে যাবে। আর এতে কমপক্ষে ৩০-৪০ ভাগ যানজটই কমে যাবে। নগরপিতা আনিসুল হক বলেন, আজকে সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ ও নিরাপত্তা নিয়ে কথা উঠেছে। আমরা এরই মধ্যে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছি। গুলশান-বনানী-বারিধারা-নিকেতন সোসাইটিকে আমরা এক করেছি। তাদের সঙ্গে মিটিং করেছি। এ এলাকায় এখন ১০০টি সিসিটিভি ক্যামেরা চলছে। শুধু তাই নয়, টঙ্গী থেকে শুরু করে সোনারগাঁও পর্যন্ত আমরা এক হাজারটি শক্তিশালী ক্যামেরা বসাচ্ছি। এ ক্যামেরাগুলো অন্ধকারেও মানুষকে শনাক্ত করতে পারবে। সবাই এ কাজে সহযোগিতা করছেন। ইতিমধ্যে প্রায় ১৫ কোটি টাকা তোলা সম্ভব হয়েছে। মানুষ দিচ্ছে। কারণ তারা নিরাপত্তা চায়। সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৩৬টি ওয়ার্ডে ৭২টি মিড-ট্রান্সফার স্টেশন বসানো হচ্ছে বলে জানান মেয়র। তিনি বলেন, আগামী মার্চের মধ্যে সব স্টেশন তৈরি করা হয়ে গেলে ৭৫ ভাগ বর্জ্য সমস্যার সমাধান হবে। তখন আর রাস্তায় বর্জ্য পড়ে থেকে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হবে না। মেয়র বলেন, অবৈধ বিলবোর্ড উচ্ছেদ অভিযানের আওতায় ডিএনসিসির ছোট-বড় ২০ হাজার বিলবোর্ড উচ্ছেদ সম্ভব হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে প্রায় ৮০ ভাগ বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলতে পেরেছি। আগামী ২০-২৫ দিনের মধ্যে বাকিগুলোও সরিয়ে ফেলা হবে। বিলবোর্ড সংক্রান্ত নতুন নীতিমালায় এলইডি বিলবোর্ডের প্রচলন ছাড়াও বিভিন্ন আধুনিক সিস্টেম ও নিয়মকানুন চালু হবে বলেও জানান মেয়র। উত্তর সিটির প্রথম নির্বাচিত মেয়র আনিসুল হক বলেন, আমি গ্রিন সিটির কথা বলেছিলাম। আমরা প্রায় ৭০০ সদস্যের স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করছি। কাজ শুরু হয়ে গেছে। শাহীন স্কুলের সামনের একটি ফুটওভার ব্রিজে পরীক্ষামূলকভাবে বাগানবিলাস ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে উত্তর সিটির ৫৬টি ফুটওভার ব্রিজই এভাবে বাগানবিলাস ফুল দিয়ে ছেয়ে ফেলা হবে। সিঙ্গাপুরের মতো আমাদের এই শহরও শুরু হবে ফুল দিয়ে। আমরা খুব শিগগিরই বাড়িতে বাড়িতে ফুলগাছসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ পাঠাব। এ ছাড়া আমরা মাঠের কাজে হাত দিয়েছি। প্রজাপতি ও কাঠবিড়ালির পার্ক তৈরি করছি। বনানী এলাকার একটি মাঠে শিশুপার্ক করারও উদ্যোগ নিয়েছি। সর্বোপরি আমরা যেভাবে পরিবেশ নিয়ে কাজ করছি তাতে আশা করছি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ শহর উপহার দিয়ে যেতে পারব। এ ছাড়া মহাখালীসহ বিভিন্ন ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকায় যত দেয়াল আছে সেগুলোকে রঙিন পেইন্টিং এবং ক্রিপারের মাধ্যমে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলা হবে। এরই মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ কিলোমিটার দেয়ালে সেটি করা হয়েছে। আর এটি কেবল সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যই নয়, নগরীর পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে তথা অসচেতন মানুষ যাতে এসব স্থানে প্রস্রাব করতে গেলে বা অন্য কোনোভাবে নোংরা করতে গেলে বিবেকে বাধে সে জন্যই এ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। মেয়র বলেন, ঢাকার রাস্তা থেকে শত শত ফিটনেসহীন বাস অপসারণে বাস মালিক সমিতির সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে করপোরেশন একটি সমঝোতায় এসেছে। তিনি জানান, এখন ঢাকা শহরে প্রায় সাড়ে তিনশ কোম্পানির সাড়ে চার হাজার বাস চলাচল করছে। এই সাড়ে তিনশ কোম্পানিকে পাঁচটি কোম্পানির আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। শর্ত অনুযায়ী ৪-৫ ভাগ সুদে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার ভালো এয়ারকন্ডিশন বাস কেনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ নিয়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথাও হয়েছে। এবার ভালো টিকিটিং ব্যবস্থা হবে। মা-বোন এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা থাকবে। রিকশাচালকদের নতুন করে লাইসেন্স দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে দু-এক বছরের মধ্যেই এই সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে। আলোকিত ঢাকা গড়ার বিষয়ে নগরপিতা বলেন, আমাদের একটি কোম্পানির সঙ্গে কথা হয়েছে। আগামী বছরের মধ্যে পুরো ঢাকা শহরে এলইডি লাইটের মাধ্যমে রাতকে দিন করে ফেলব। তাও আমাদের সংস্থার নিজস্ব টাকায়। আগামী ১০ বছর কোনো স্থানের কোনো লাইট ৪৮ ঘণ্টার বেশি অফ থাকতে পারবে না, এমনটিই চুক্তি হচ্ছে ওই কোম্পানির সঙ্গে। সংস্থার সবাইকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসছেন মেয়র। তিনি বলেন, এ সংস্থায় ১০ বছর ধরে নিয়মিত বদলি করা যেত না। যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা হয়তো বদলি করতে ভয় পেতেন। আমি কাউন্সিলরদের সহযোগিতা ও সমর্থনে একসঙ্গে ১৬৯ জনকে বদলি করে দিয়েছি। কেউ কোনো কথা বলেননি। এ ছাড়া কাজে স্বচ্ছতা আনতে আমরা ই-টেন্ডারও চালু করেছি। ফুটপাথ দখলমুক্তকরণ বিষয়ে মেয়র আনিস বলেন, চাইলেই কিন্তু আমরা ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে পারি। কিন্তু হুটহাট করে তা করতে চাই না। কারণ এই ফুটপাথ দখলের পেছনে যেমন প্রভাবশালীদের হাত রয়েছে, তেমনি খেটে খাওয়া ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও জীবিকানির্বাহের বিষয় রয়েছে। তাই আস্তে ধীরে তাদের পুনর্বাসন করে একটি স্থায়ী সমাধানের মাধ্যমে ফুটপাথ দখলমুক্তকরণের ব্যবস্থা হচ্ছে।
যে বিষয়ে নিজের সহায়ত্বের কথা প্রকাশ করলেন মেয়র : আনিসুল হক বলেন, যা নিয়ে তার সবচেয়ে বেশি সমস্যা, নগরবাসীর সবচেয়ে বেশি সমস্যা, মেয়র হিসেবে যে বিষয়ের প্রতিকারে তিনি কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না তা হলো জলাবদ্ধতা। তিনি বলেন, অবৈধ দখলের মাধ্যমে খাল এবং ড্রেনেজ সিস্টেম ধ্বংস করা হয়েছে। বিশেষ করে বড় খালগুলো সিমেন্টেড হয়ে গেছে। এখানে ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাব রয়েছে। এ খালগুলোকে যদি দখলমুক্ত করে এখনই স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা না যায়, তবে আগামী বর্ষায় কী হবে বলতে পারছি না। তবে তারপরও ৪৬টি খালের মধ্যে গত পরশু ১৩টি খালের সচিত্র প্রতিবেদন করপোরেশন এলজিইডি মন্ত্রীকে দেখিয়েছে। মেয়র বলেন, আমরা বলেছি আপনারা খালগুলো দখলমুক্ত করে দিন, এরপর রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। মেয়র বলেন, এখন নগরবাসীর কাছে একটিই অনুরোধ, তারাও যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য নাগরিক দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন হন। তেজগাঁওসহ যেসব স্থান ডিএনসিসি দখলমুক্ত করেছে সেগুলোর সুরক্ষায় পুলিশ যেন তাদের দায়িত্ব পালন করে।