দু-তিন বছরের আগে জলাবদ্ধতা ও যানজট থেকে ঢাকাবাসীর মুক্তির কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না দুই মেয়র আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন। তাঁরা বলেছেন, জলাবদ্ধতা ও যানজট দূর করতে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলেই হয়তো কিছুটা সুরাহা হবে সমস্যার। এ বিষয়ে দুই মেয়রের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রথম আলোর নগর সম্পাদক কামরুল হাসান

প্রথম আলো: নির্বাচনে অনেক প্রতিশ্রুতি ছিল নগরবাসীর জন্য। আপনার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১০০ দিন পার হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে বৃষ্টিতে নগরবাসী তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন। কেন এ অবস্থা, আপনি কী বলবেন?

আনিসুল হক: যে খাল দিয়ে পানি নামবে সেটা জ্যাম, যে ড্রেন দিয়ে পানি নামবে সেটা জ্যাম। পানি নামবে কোথায়? জলাবদ্ধতা কেন হবে না? এখন যে অবস্থা, তাতে লাখ লাখ লোক লাগানো হলেও ড্রেন পরিষ্কার রাখা সম্ভব নয়। যেখানে যাচ্ছি, দেখছি যত্রতত্র নির্মাণকাজ হচ্ছে। নির্মাণকাজের জিনিসপত্র হয় ড্রেনে ফেলছে, না হয় স্যুয়ারেজের ভেতরে। স্যুয়ারেজের মুখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমরা ড্রেন পরিষ্কার করার নতুন মেশিন কিনেছি। কিন্তু সেটা দিয়ে ড্রেন পরিষ্কার করতে পারছি না। ড্রেনের ভেতরে সিমেন্ট জমে শক্ত হয়ে গেছে। কী করে জলাবদ্ধতা কমাব?

প্রথম আলো: তাহলে বলছেন, এর কোনো সমাধানই নেই?

আনিসুল হক: না, সেটা বলছি না। এখন এলাকায় এলাকায় যাচ্ছি। লোকজনকে বলছি, আপনি যদি নিজে পরিষ্কার না হন, তাহলে শহর পরিষ্কার হবে কী করে। লোকজনকে সচেতন করার পাশাপাশি সব সংস্থাকে নিয়ে সমন্বয় সভা করেছি। সেমিনার করেছি। সাধ্যমতো করে যাচ্ছি। তা ছাড়া আমরা তো এ বছর খুব কম সময় পেলাম।

প্রথম আলো: জলাবদ্ধতার সঙ্গে ট্রাফিক জ্যাম, সেটা নিয়ে কিছু ভাবছেন?

আনিসুল হক: এটা ক্রনিক সমস্যা। ১০-২০-৩০-৪০ বছরে হয়েছে। তবে আমার এলাকায় জ্যাম বেশি। কারণ, এ এলাকায় বিত্তবানেরা বেশি থাকেন। একজনের বাড়িতে পাঁচটা গাড়ি। সব রাস্তায় নেমে জট তৈরি করছে। রাস্তা তো আর বাড়ছে না। তা ছাড়া এ এলাকার রাস্তায় ট্রাফিক সংকেতও বেশি। একটু পরপর সংকেত। যানজট তো হবেই। তারপরও আমরা পরিবহনমালিকদের সঙ্গে কথা বলেছি, গণপরিবহন নিয়ে আলোচনা করেছি। যদি বেশি করে বাস নামাতে পারি, যানজট হয়তো কমবে।

প্রথম আলো: না হলে সমাধান কী হবে?

আনিসুল হক: আমরা ১২ সেপ্টেম্বর একটি সেমিনার করার কথা ভাবছি। সেখানে যাঁরা আসবেন, তাঁদের বলব সবাই পাঁচটি করে সমস্যা বলবেন। কী করে সেসব সমস্যার সমাধান করা যায়, সেটা নিয়ে আলোচনা হবে। আমরা বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কথা বলছি, কিন্তু যেখানে যাচ্ছি সমস্যা এত বেশি যে তার সমাধান করাও সহজ নয়। এলাকায় দেখি কেউ হয় হাউজিং করেছে, না হলে রাস্তা-মাঠ দখল করে রেস্টুরেন্ট করে ফেলেছে। মাটি ফেলে লেকের মুখ, ড্রেনেজ বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা কতজনকে বলব?

প্রথম আলো: কয়েক দিন আগে আপনার উপস্থিতিতে নগর ভবনে এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ঢাকার নিকাশি ব্যবস্থা ঠিক না হলে ১৫ বছর পর মানুষ রাস্তায় সাঁতার কাটবে।

আনিসুল হক: শুনেছি। আপনি তো ড্রেনের কথা বলছেন। ড্রেন আছে অনেক সংস্থার। তিনটি সংস্থা ড্রেন পরিষ্কার করে। এটা কোনো যৌক্তিক কাজ হতে পারে না। যে যার মতো করে ড্রেন তৈরি করছে-ব্যবহার করছে। আসলে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার ভিত্তিতে এই শহর গড়ে ওঠেনি। যেমন বর্জ্যের দিকে তাকান। বর্জ্য ফেলার কোনো জায়গা নেই। আপনার বাড়ি থেকে যে বর্জ্য নিচ্ছে, সেটা কোথায় ফেলবে? আসলে মাত্র পাঁচ লাখ লোকের জন্য এই শহর তৈরি করা হয়েছিল। এখন দুই কোটি লোক বাস করে। সমস্যা তো হবেই।

প্রথম আলো: তাহলে জলাবদ্ধতা কি দূর হবে না?

আনিসুল হক: আসলে এ বছর আমরা সময় পাইনি। আমাদের বুঝতেও সময় চলে গেছে। কিছু ঘটলে, জলাবদ্ধতা হলে আমরা এলাকায় যাচ্ছি। লোকজন পরিষ্কার করছে। কিন্তু সেটা সমস্যার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। কত বলব। এই দেখেন রাস্তার কথা বলি। বেশির ভাগ এলাকার রাস্তা নষ্ট হয়ে গেছে। রাস্তাগুলো ভালোভাবে তৈরিই হয়নি। খুবই নিম্নমানেরকাজ হয়েছে।

প্রথম আলো: দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিচ্ছেন না কেন?

আনিসুল হক: আমি ৩৬টি এলাকার মধ্যে ২৯টিতে গিয়েছি জলাবদ্ধতা দেখার জন্য। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কাউন্সিলরদের বলেছি জলাবদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দিন। কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা আছে যে খাল পরিষ্কার করার ছয় মাসের মধ্যে আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে। কারণ, লোকজন প্রতিনিয়ত সেখানে ময়লা ফেলে ভরাট করছে। এক খালের মাথায় গিয়ে দেখি, খালের মুখে হাউজিং বানিয়ে পানি নামার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাহলে সমাধান হবে কী করে?

প্রথম আলো: স্বল্পমেয়াদি কিছু ভাবছেন না?

আনিসুল হক: কাউন্সিলরদের বলেছি, প্রথম বছর হিসেবে এক বছর পার করলেন। কিন্তু আগামী বছর লোকজন আমাদের গালাগালি করবে। আপনারা অবৈধ স্থাপনা উৎখাত করুন। প্রকৌশলীদের বলেছি, জলাবদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা করেন। না হলে মানুষ আমাদের ছাড়বে না।

প্রথম আলো: তাতে কি নগরবাসী আশাবাদীহতে পারেন…

আনিসুল হক: বিশেষ করে গুলশান, উত্তরা, বনানী ও বারিধারা এলাকায় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এটা বাস্তবায়িত হলে পানি আর জমবে না। এ বছরের পর থেকেই এটা আপনারা বুঝতে পারবেন। আমি আশা করি, আগামী তিন বছরের মধ্যে জলাবদ্ধতা কমে যাবে।

View Source PDF