পরিচ্ছন্ন-সবুজ-আলোকিত-মানবিক ঢাকা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন ঢাকা উত্তরের মেয়র প্রার্থী আনিসুল হক। আওয়ামী লীগ সমর্থিত এ মেয়র প্রার্থী তার নির্বাচনী ইশতেহারে ঢাকা উত্তরের নানাবিধ সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের পথ দেখিয়েছেন।

ঢাকা উত্তরে চিহ্নত সমস্যা সমাধানে ৬ ধরনের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছেন তার ১১ পৃষ্ঠার ইশতেহারে।

শনিবার (১১ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর নিকুঞ্জে লোটাস কামাল টাওয়ারে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন এ মেয়র প্রার্থী।

ঘোষিত ইশতেহার আনিসুল হক বলেন, চার’শ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক এ শহর। যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিনির্মাণের গল্প। আমি আশাবাদী আমরা সবাই মিলে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও নিরাপদ ঢাকা গড়ে তুলতে পারবো।

তিনি বলেন, ঢাকার যে সমস্যা তা চিহ্নিত করে আমরা বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তুলবো। নগর বিনির্মাণে আমাদের দর্শন হচ্ছে গরিব, ধনী সকলের জন্য মানবিক এক ঢাকা। যেখানে নাগরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে সবকিছুর ওপরে। মানুষের অধিকার থাকবে সুরক্ষিত।

তিনি বলেন, শহরের প্রতি মালিকানাবোধ শহরকে পরিবার বা বাড়ির মত করে দেখতে পারাটা আমার কাছে খুবই জরুরি। আমি এভাবেই ভাবি। আর ভাবি বলেই ঢাকা আমার কাছে আলাদা বিষয় নয়। আমি-আপনি-আমরাই ঢাকা। ঢাকাকে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সঠিক নেতৃত্ব।

‘নগর ভবন দলীয় কার্যালয় হবে না’ এ অঙ্গীকার করে আনিসুল হক বলেন, সকল মানুষের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে এটি পরিচালিত হবে। আমি নগরীর পিতা নই, নাগরিকদের বন্ধু হতে চাই। নগর পিতা শব্দটির মধ্যেই এক ধরনের নিঃসঙ্গ, কর্তৃত্ববাদী শাসকের ইমেজ ফুটে ওঠে। মেয়র বলতে আমি বুঝি, মেয়র বলতে বোঝায় সৎ শ্রেণীর নাগরিকের প্রতিনিধি।

তিনি বলেন, আমার লক্ষ্য নির্দিষ্ট, পরিকল্পনা স্বচ্ছ, ভবিষ্যত উজ্জল। অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন করতে চাই।

আনিসুল হক তার ঘোষণায় বলেন, বর্তমান সরকারের গত ৬ বছরে ঢাকাকে নিয়ে বহু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়েছে। আরো বহু কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

এরমধ্যে বনানী-মিরপুর ফ্লাইওভার,ভূর্গস্থ স্যুয়ারেজ লাইন নির্মাণ, নতুন সড়ক নির্মাণসহ বহু কাজ হয়েছে। মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, মগবাজার ফ্লাইওভারসহ আরো কিছু উন্নয়ন প্রকল্প চলমান। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পুরো ঢাকার চেহারা বদলে যাবে।

তিনি বলেন, ঢাকার শহরে এরপরেও আরো বহু সমস্যা বিদ্যমান। যা সমাধানে প্রয়োজন একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি। যিনি জনগণ ও সরকারের হয়ে নাগরিকদের এসব সমস্যা সমাধান করবেন।

আনিসুল হক বলেন, সির্টি কর্পোরেশন আইনে ২৮ ধরনের কাজ সুনির্দিষ্ট করা হলেও মেয়রের আইনি কর্তৃত্বের অভাব রয়েছে। তবে আমরা সবাই যদি উদ্যোগী হই, দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করি, ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে শহর বির্নিমাণে অংশগ্রহণ করি, তবে অবশ্যই উত্তর ঢাকায় বহু দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবেই।

যার নেতৃত্বে থাকবে জনগণ, আমি তাদের সাথে থাকতে চাই। আমি নাগরিকদের কাছ থেকে জানতে চাই, শুনতে চাই। জানতে ও দেখাতে চাই, আমরা যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখি।

তিনি আরো বলেন, সিটি কর্পোরেশনকে ৫৬টি সরকারি সেবা সংস্থার ওপর নির্ভর করে চলতে হয়। এসব সেবা সংস্থার সাথে সুষম সমন্বয় করা হবে। এজন্য প্রয়োজন হলে আইনি পরিবর্তনের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাবো নির্বাচিত হলে।

মেয়র প্রার্থী আনিসুল হক বলেন, ঢাকা উত্তরে ইতোমধ্যে যেসব সমস্যা চিহ্নত হয়েছে বা যেসব সমস্যা রয়েছে তা সমাধানে স্বল্প মেয়াদী, মধ্য মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনাও করেছি আমরা। নির্বাচিত হলে ৫ বছরের মধ্যে ঢাকা উত্তর নির্দিষ্ট একটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে নাগরিকদের সামনে দৃশ্যমান হবে এটা আমার প্রতিশ্রুতি।

পরিচ্ছন্ন,সবুজ আলোকিত মানবিক ঢাকা গড়তে আনিসুলে হকের ৬ প্রতিশ্রুতির মধ্যে অন্যতম পরিচ্ছন্ন সবুজ ও পরিবেশবান্ধব ঢাকা, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর ঢাকা, সচল ঢাকা, মানবিক উন্নয়নের ঢাকা, স্মার্ট ও ডিজিটাল ঢাকা, অংশগ্রহণমূলক ও সুশাসিত ঢাকা। এসব প্রতিশ্রতি বাস্তবায়নে করণীয় তুলে ধরেন আনিসুল হক।

পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও পরিবেশবান্ধব ঢাকা গড়তে আনিসুল হক যা করবেন
রাস্তাঘাট, বাসা-বাড়ি নির্মাণ এবং নগর পরিকল্পনায় সবুজায়নকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। সবুজ ঢাকা গড়ে তুলতে এলাকাভিত্তিক পরিকল্পিত বনায়ন করা হবে। নগরপরিকল্পনায় পরিবেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। নগরায়ন হবে পরিবেশ বান্ধব। জল, জমি, বায়ূ, শব্দ দূষণের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া হবে। শহরের ভেতরে পার্ক, মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান চিহ্নিত করা হবে। বেদখল পার্ক ও মাঠ উদ্ধার করে খেলাধুলা ও শরীর চর্চা উপযোগী করা হবে। এলাকাভিত্তিক জলাবদ্ধতা দূরীকরণে স্থানীয় এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ সাপেক্ষে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসণে নিয়মিত এবং বিশেষভাবে বর্ষা মৌসুমের (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) পূর্বেই ড্রেনগুলো পরিষ্কার করা হবে। ড্রেন পরিষ্কারে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির বাহন আনা হবে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা হবে। দুর্গন্ধ মুক্ত নগরী করতে পর্যায়ক্রমে ময়লার ভাগারগুলো (ডাস্টবিন) সরিয়ে নেওয়া হবে। শহরের ভেতরের লেকগুলোতে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হবে।

স্বাস্থ্যকর ঢাকা গড়তে যা  করবেন
ফরমালিনমুক্ত বাজার গড়ে তোলা হবে। স্বাস্থ্যহানিকর খাবার ও ভেজালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন বাজারে উৎপাদিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নগরীর ৫টি জোনে নারীসহ সকলের জন্য আধুনিক শৌচাগার নির্মাণ করা হবে। পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হবে। নাগরিকদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবাকে অনলাইন ভিত্তিক করা হবে। মাদক ও সামাজিক অনাচার প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঢাকা উত্তরের সড়কগুলোকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হবে। প্রতিটি সড়কে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হবে।

সচল ঢাকা করতে যা করবেন

যানজট কমাতে শহরের উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যে কয়েকটি সংযোগ সড়ক করা হবে। শহরের ভেতরে চলাচলকারী যানবাহনের ক্ষেত্রে একটি মানদণ্ড ঠিক করা হবে। রাস্তা সচল রাখতে কমিউনিটি পুলিশ নিয়োগ করা হবে। গণপরিবহণের ওপর চাপ কমাতে এবং নিকটতম যোগাযোগের জন্য বাইসাইকেল উৎসাহিত করা হবে। নগরবাসীকে হাঁটায় উৎসাহিত করা হবে। ফুটপাতকে পথ ব্যবসায়ীবান্ধব (হকার) কিন্তু পথচারী চর্চাকে প্রাধান্য দিয়ে একটি পারস্পরিক নির্ভরশীল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হবে।

মানবিক উন্নয়নের ঢাকা গড়তে যা করবেন

ঢাকা উত্তর হবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান উপযোগী নগরী। কর্মজীবী মায়েদের জন্য পর্যায়ক্রমে ৩৬টি ওয়ার্ডে একটি করে ডে কেয়ার সেন্টার করা হবে। রাজধানীতে ঠাই নেওয়া তরুণ-তরুণীদের জন্য ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে নিরাপদ ও আধুনিক কর্মজীবী হোস্টেল করা হবে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বিনোদন চর্চায় একটি নাগরিক কেন্দ্র (সিভিক সেন্টার) করা হবে। সিটি কর্পোরেশন একটি অনুদান তহবিল প্রতিষ্ঠা করা হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সহায়তার জন্য তাদের ডাটাবেজ করা হবে।

স্মার্ট ও ডিজিটাল ঢাকা গড়তে যা করবেন

নগরীর ভেতরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, বাস স্টপেজ, নারীদের জন্য বিশেষ বাসে বিনামূল্যে ওয়াই ফাইয়ের ব্যবস্থা করা হবে। একটি ই-লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা হবে। নাগরিক সমস্যা জানানো, সেবা সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সমৃদ্ধ মোবাইল অ্যাপস চালু করা হবে। সকল সেবাসমূহকে পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল করা হবে এবং ই সেবা চালু করা হবে।

অংশ গ্রহণমূলক ও সুশাসিত ঢাকা গড়তে যা করবেন

সিটি কর্পোরেশন হবে দুর্নীতিমুক্ত। দুর্নীতি বন্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োগ করা হবে। নাগরিক সেবা, অভিযোগ ও সমাধানে ২৪ ঘণ্টার হটলাইন চালু করা হবে। একটি নগর তথ্য কেন্দ্র খোলা হবে। নগর উন্নয়ন, পরিকল্পনা প্রণয়নে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উপদেষ্টা কাউন্সিল বা পরার্শক কমিটি করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে নাগরিকদের মতামত নেওয়া হবে।

ইশতেহার পাঠের সময় উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ফারুক খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ব্যবসায়ী নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সংরক্ষিত আসনের এমপি তারানা হালিম, আনিসুল হকের স্ত্রী ও মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষার প্রমুখ।