বাংলা ভাষাভাষী মানুষের ফেসবুক ওয়াল প্রিয় মানুষ হারানোর বেদনায় বিষাদে ছেয়ে গেছে। যে যার মত সদ্য প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক ও তার কর্মময় জীবন নিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, মন্তব্য করছেন। কেউ-কেউ তার সঙ্গে কাটানো স্মরণীয় মুহূর্ত রোমন্থন করে ব্যথিত হচ্ছেন। বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ২৩ মিনিটে লন্ডনের ওয়েলিংটন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মেয়র আনিসুল হক না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুর পরপরই বিভিন্ন জনের স্ট্যাটাসে বিষাদে ভরতে থাকে ফেসবুক। এক সময়ের প্রখ্যাত টিভি উপস্থাপক, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি আনিসুল হককে নিয়ে শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকেও অনেককে ফেসবুকে বিষাদময় স্ট্যাটাস দিতে দেখা যায়।

বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আনিস ভাই কথা রাখেননি। আনিস ভাইর বাড়িতে আড্ডা হতো। কখনো কখনো বড় আড্ডা। আবার কখনো ৫/৬ জনের। ছোট, বড় দুই আড্ডায় আমন্ত্রণ পেতাম, যেতামও। মেয়র হওয়ার পর আনিস ভাইর ব্যস্ততার শেষ ছিল না। স্বপ্নবাজ মানুষটি ঢাকা শহরকে বদলে ফেলতে চান। মাঝে মাঝে ফোন করতেন। বলতেন, আমি কঠিন কিছু কাজ করতে চাই। মাফিয়াদের বিরুদ্ধে লড়ছি। আপনারা পাশে এখন না থাকলে কিভাবে হবে? জবাব দিতাম, আনিস ভাই লড়ে যান। আছি সাথে। কখন কি করতে হবে শুধু জানাবেন। মেয়র সাঈদ খোকন মাঝে মাঝে ফোন দিতেন। তার সঙ্গে হানিফ ভাইয়ের আমল থেকে সম্পর্কটা। খোকনের কণ্ঠে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা। ভালো লাগতো খোকনের পাল্টা চেষ্টার ইতিবাচক প্রতিযোগিতা দেখে। আনিস ভাইয়ের প্রতি সম্মান আরও বাড়তো তখন। পাশাপাশি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতাম ক্লান্তিহীন পথ চলা এক যোদ্ধাকে। বলা যায় ২৪ ঘণ্টার কর্মবীর এক মেয়রকে। তিনি বদলে ফেলতে চান সবকিছু। এক একটি এলাকা ধরছেন, আর পরিবর্তন করছেন। ঢাকাকে ঘিরে যখন আশার আলো দেখছিলাম, তখনই নগর যোদ্ধা গেলেন লন্ডন। ভালো কথা ঠিক সময়ে ফিরে আসবেন। কিন্তুু না, আনিস ভাই এই নগরবাসীকে দেওয়া কথা রাখলেন না। তিনি লন্ডন থেকে আজ ঠিকই ফিরবেন, কিন্তুু আর লড়বেন না এই শহরকে আলোকিত করতে। প্রিয় আনিস ভাই, কাজটি ঠিক হলো না। এভাবে আপনি যেতে পারেন না। এভাবে চলে যাওয়া যায় না। এভাবে যাওয়া ঠিক নয়।’

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন লিখেছেন, ‘সত্যি চলে গেলেন আনিসুল হক। স্বপনদ্রষ্টা আনিসুল হক তার স্বপ্ন অধরা রেখে চলে গেলেন অজানার পথে। সেই যে প্রথম যৌবনে ‘অন্তরালে’ দেখতে দেখতে আমরা সব বন্ধুরা তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। অনেক বছর পর সরাসরি দেখা, পারিবারিক আড্ডা। দেখেছি তার কর্ম দক্ষতা, কর্ম তৎপরতা। আধুনিক পরিচ্ছন্ন একটি ঢাকা গড়ার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছিলেন। আপনাকে বড় প্রয়োজন ছিল এ নগরীর। বড় অসময়ে চলে গেলেন। যেখানে থাকুন ভালো থাকুন। প্রিয় মেয়র আপনাকে এ নগরীর মানুষ সব সময় মনে রাখবে, ভালোবাসবে। আল্লাহ যেন রুবানা ভাবী ও তার সন্তানকে এই শোক সইবার শক্তি দেন। আমরা আছি আপনাদের পাশে। আপনাদের শোক যেন আমরা ভাগ করে নিতে পারি..।’

আনিসুল হকের সঙ্গে নিজের ছবি পোস্ট করে চিত্রনায়িকা পরীমনি বলেছেন,’মেয়র আনিসুল হক আপনাকে এত ভালোবাসতাম টের পাইনি আগে..।’

‘আদিত্য আরাফাত নামে একজন লিখেছেন, ‘আর ফিরলেন না আনিসুল হক। মৃত্যু কঠিন বাস্তবতায় দাঁড় করায় আমাদের।’

ব্যাংকার মুশফিক-উস সালেহীন উজ্জ্বল লিখেছেন, ‘খুবই কষ্ট করে বড় হওয়া এই মানুষটি যখন মেয়র হলেন তখন ভেবেছিলাম গার্মেন্টস সেক্টরে সফল মানুষটি ঢাকা শহরটিকে গার্মেন্টসের পরিকল্পনার মতোই পরিকল্পনা মাফিক সুন্দর করে তুলবেন। তার প্রভাব বর্তমান ঢাকা শহরের ফুটপাত দেখলেই বোঝা যায়। নীলক্ষেত, নিউমার্কেট ও আরো অন্যান্য ফুটপাত যেখানে হকার মুক্ত করা অনেকের কাছে অসম্ভব মনে হয়েছিল, তা তিনি তার দৃঢ়তা ও সফল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সফল করেছেন। জানিনা প্রিয় মানুষটি চলে যাওয়ার পর ফুটপাতগুলো আবার ফার্মগেটের ফুটপাতে মত হয়ে উঠবে কিনা। ফার্মগেটে আবার যদি শোনা যায়, একশ-একশ দেইখা লন, একশ বাইছা লন- একশ। তাহলে বুঝবো আনিসুল হক সত্যিই মারা গেছেন। আর যদি তিনি যে plan করেছিলেন তা সফল হয় বা বর্তমান অবস্থায় থাকে অর্থাৎ ফুটপাত মোটামুটি দখলমুক্ত থাকে, তাহলে বুঝবো এই প্রিয় শহরের সফল মেয়র বেঁচে আছেন প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি পথচারীবান্ধব ফুটপাতে, প্রতিটি সুন্দর সড়কের পাশে, প্রতিটি সুন্দর প্ল্যানের পাশে, ভালো থেকো হে নগরপিতা। এ অভাব পূরণের নয়।’

আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশি আশিফ এন্তাজ রবি তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আনিসুল হকের একটি বিশেষ প্রতিভা নিয়ে কাউকে কথা বলতে দেখলাম না। এই প্রতিভাকে বলে, কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্ট। দুইটা দল ঝগড়া করছে, তাদেরকে মিলমিশ করিয়ে দিতে তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন। এই রকম দুটি বড় ঘটনা দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছিলো। ব্যান্ড সঙ্গীত তখন সবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। এই নতুন ধারার গান শুনে তরুণরা আত্নহারা। কিন্তু প্রবীণের মাথা ঝাঁকিয়ে বলছেন, গেলো গেলো, সব গেলো। আনিসুল একটি অভাবনীয় ব্যাপার ঘটালেন। টিভিতে একটি গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। যারা ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি পড়ে, পবিত্র…’

ব্যাংকার প্রণব কুমার বলেন, ‘সাহসী মানুষেরা, ভাল মানুষেরা এভাবেই চলে যাবে, আবার সবকিছু নষ্টদের দখলে যাবে…’

‘যেভাবে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন সেটাতে আপত্তি ছিল, তাই দূরে ছিলাম। কিন্তু আসলেই আমাদের দূরত্ব ছিল না। স্বপ্ন দেখা এবং বদলে দেবার স্বপ্ন দেখানো মানুষের অভাবের মাঝে আপনি ছিলেন আলাদা। আপনার স্বপ্ন বেঁচে থাক। একদিন বদলে যাবে ঢাকা। আপনার মত কেউ একদিন দেশ বদলে দেবার স্বপ্ন দেখাবে….সামনে আসবে’- এসব কথা লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি শাহেদ আলম।

সাংবাদিক হুসাইন আজাদ লিখেছেন, কোনো পক্ষ ‘কমিশন’ চাইলে নাকি আপনি মিটিংয়ের মধ্যেই ওপর মহলে ফোন দিয়ে বলতেন, আপার সাথে কথা বলেন। দেশের রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে যেখানে ভুরি ভুরি মিথ্যা গল্প রচিত হয়, সেখানে আপনার পক্ষে এই গল্পটাই আপনাকে আলাদা করে দেয়! ভালো থাকবেন আনিসুল হক..। ঢাকায় ভালো কাজের যে প্রতিযোগিতা আপনি শুরু করে দিয়ে গেছেন, তা যেন চলতে থাকে…।

সাংবাদিক প্রভাষ আমীন লিখেছেন, ‘বেদনার সকাল। কাল রাতে একটুও ঘুমাতে পারিনি, সারারাত ছটফট করেছি আর লিখেছি বেদনার পংক্তিমালা। ভোরে একটু চোখ লেগেছে। ঘুম ভেঙ্গেছে আবারও সেই বেদনার তীব্র অনুভূতি নিয়ে। সাড়ে ৩ মাস ধরেই তিনি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে, তারপরও প্রিয় আনিসুল হক নেই, এটা আসলে নিজেকে বিশ্বাস করাতেই কষ্ট হচ্ছে। আনিস ভাই, আমি একজন নগন্য সংবাদকর্মী। আপনার জন্য কিছুই করতে পারবো না। সামর্থ্য থাকলে পৃথিবীর সকল শুভ্রতা আজ আপনাকে এনে দিতাম।’

প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ২৩ মিনিটে লন্ডনের ওয়েলিংটন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন ঢাকা উত্তর সিটি মেয়র আনিসুল হক। মেয়ের সন্তান জন্ম উপলক্ষে গত ২৯ জুলাই ব্যক্তিগত সফরে সপরিবারে লন্ডন যান আনিসুল হক। গত ৪ আগস্ট তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে লন্ডনের ন্যাশনাল নিউরোসায়েন্স হসপিটালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার মস্তিস্কের প্রদাহজনিত রোগ ‘সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিস’ শনাক্ত করেন চিকিৎসকরা।একপর্যায়ে শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে গত ৩১ অক্টোবর তাকে আইসিইউ থেকে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। পরে থেরাপি দেওয়ার জন্য তাকে অন্য একটি হাসপাতালে নেয়া হয়। এরইমধ্যে গত ২৬ নভেম্বর তার অবস্থার অবনতি হলে আবারও তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।

আনিসুল হকের জন্ম ১৯৫২ সালের ২৭ অক্টোবর ফেনীর সোনাগাজীর আমিরাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের মাতুলালয়ে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন। আশি-নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে বিটিভিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়ে মুখোমুখি অনুষ্ঠানও করেন। সেই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন আনিসুল হক। আশির দশকেই তিনি সাবেক সচিব নুরুল হকের দেশ গার্মেন্টে চাকরিজীবন শুরু করেন। পরে যোগ দেন মোহাম্মদী গ্রুপে। এক পর্যায়ে গার্মেন্ট ব্যবসায় যুক্ত হন। ২০০৫ সালে তিনি বিজিএমইএর সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়া মেয়র হওয়ার আগে ২০০৮ সালে তিনি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতিও নির্বাচিত হন। ইতিমধ্যে তিনি মোহাম্মদী গ্রুপের দায়িত্ব নেন। মেয়র হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি মোহাম্মদী গ্রুপের চেয়ারম্যানের পদে আসীন ছিলেন। তার স্ত্রী রুবানা হক বর্তমানে মোহাম্মদী গ্রুপের দায়িত্বে আছেন। তাদের তিন সন্তান রয়েছে। তাদের ছেলে নাভিদুল হক যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের বেন্টলি ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবস্থাপনায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে মোহাম্মদী গ্রুপের পরিচালক ও দেশ এনার্জি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনে আনিসুল হক আওয়ামী লীগ থেকে মেয়র পদের মনোনয়ন পান। নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিএনপি দলীয় প্রার্থী তাবিথ আউয়ালকে পরাজিত করেন। তিনি মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগেরও সদস্য ছিলেন।