আশা জাগানিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক বছর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়রের দায়িত্ব নেন আনিসুল হক। জরুরি নাগরিক সমস্যা নিরসনে তিনি দৃশ্যমান পদক্ষেপও নিয়েছেন। ঢাকা উত্তরের চিত্রকল্প বদলে দেওয়ার স্বপ্ন তার। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকায় বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিতে পেরেছেন

সমকাল :একটি বছর পেরিয়ে গেল। মেয়র হিসেবে অনেক অম্লমধুর অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিছু বলবেন?
আনিসুল হক :মেয়র হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে গভীর রাতে এক ভদ্রলোক ফোনে বললেন, তার বাসার সামনে একটা কুকুর অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে আছে। কুকুরটি যেন সরিয়ে নেওয়া হয়। ভদ্রলোককে বললাম, চিন্তা করবেন না; ব্যবস্থা নিচ্ছি। তার পর স্ত্রীকে বললাম, এখন কুকুরটার জন্য দোয়া করা ছাড়া আমার কিছুই করণীয় নেই। তুমিও একটু দোয়া করো। এই বলে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘণ্টাখানেক পর ভদ্রলোক আবার ফোনে বললেন, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনার কর্মীরা এসে কুকুরটা নিয়ে গেছে। বুঝতে পারলাম, আমার কর্মীরা তো সরিয়ে নেয়নি; ওই ভদ্রলোকের বাসার আশপাশে অনেক কোরিয়ান থাকে। হয়তো তারা কুকুরটি নিয়ে গেছে। বিপরীত চিত্রও আছে। প্রতিদিনই নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে। কোনো কোনোটি খুবই চ্যালেঞ্জিং। ওইসব চ্যালেঞ্জিং কাজ করতে গিয়ে অনেকের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি হয়; সম্পর্ক খারাপ হয়। শেষ পর্যন্ত আলোচনায় সমাধানও হয়।
সমকাল :একটা উদাহরণ-
আনিসুল হক :রাজধানীতে হাজার হাজার অবৈধ বিলবোর্ড ছিল। ২০টি বিলবোর্ডে হাত দিতে হলেও ভয় হতো। এর পেছনে অনেক রকম শক্তি কাজ করত। বিলবোর্ড উচ্ছেদের সময় অনেকে ‘প্রয়োজনে রক্তগঙ্গা’ বইয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। মেয়র পদে থাকতে পারব না বলে হুঙ্কার দিয়েছে। পরে আলোচনা করেছি। তাতে কাজ না হওয়ায় জোর-জবরদস্তি করেই বিলবোর্ড সরিয়েছি। অনেক সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও মনোমালিন্য হয়েছে। যাদের আমরা তোয়াক্কা করি, তাদের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। আসলে মেয়রের কাজ অনেক চ্যালেঞ্জিং। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এমন একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, প্রভাবশালীরা এতই ক্ষমতাধর; যেখানেই হাত দেবেন সেখানেই বাধা। তবে মনে হয়, এখন পর্যন্ত খুব খারাপ যায়নি।
সমকাল :সমস্যা তো অন্তহীন। দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই অগ্রাধিকারের একটি তালিকা দিয়েছিলেন। কতটা পেরেছেন, কতটা পারেননি?
আনিসুল হক :সবুজ ঢাকার অঙ্গীকার করেছি। যানজট, জলজট ও বর্জ্যমুক্ত নিরাপদ স্মার্ট সিটির কথা বলেছি। প্রত্যেকটির কাজে হাত দিয়েছি। নগরীকে পরিচ্ছন্ন করতে বিলবোর্ড ফেলেছি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ৭২টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন প্ল্যান্টের মধ্যে ১৪টির কাজ শুরু হয়েছে। ৫৮টি তৈরির কাজ চলছে। লেকগুলো পরিষ্কার করছি। ১০০টি গণশৌচাগারের পরিকল্পনা রয়েছে। কয়েকটি তৈরি হয়েছে। সেগুলো ফাইভ স্টার হোটেলের মানের ওয়াশরুমের চেয়েও সুন্দর। ৭৫০টি ডাস্টবিন বসানো হয়েছে। আরও ৫-৬ হাজার ডাস্টবিন বসানো হবে। অসম্ভব জটিল জায়গাও পরিষ্কার করেছি। যানজট মোকাবেলায় ১০টা জায়গা ক্লিন করেছি। কারওয়ান বাজার পরিষ্কার হয়েছে। আমিনবাজার-শ্যামলী সড়ককে পার্কিং-ফ্রি করেছি। পরিষ্কার হয়েছে আব্দুল্লাহপুর, তেজগাঁও, সাতরাস্তা ও মোহাম্মদপুর এলাকা। পরিষ্কার করলেই হবে না; পুলিশের দায়িত্ব সেগুলো তদারকির। আমার তো পুলিশ নেই। দেড়শ’ পুলিশ চেয়েছি। একশ’ পুলিশ দিলেও সমস্যার সমাধান করা যেত। গাবতলী সড়ক যাতে আবার আগের অবস্থায় ফিরে না যায়, এ জন্য ওই সড়কে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছি। যানজট নিরসন কঠিন হলেও ২২টি ইউলুপ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি। আগামী চার-পাঁচ মাসের মধ্যেই সেগুলো তৈরি হবে। ৩ হাজার বাস নামানোর উদ্যোগ, ১১৮ কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণ, ১৪৮ কিলোমিটার ড্রেন তৈরি এবং ৬৮ কিলোমিটার ড্রেনের সংস্কার করেছি। খালগুলো সংস্কারের কাজ চলছে। গুলশান-বনানী-বারিধারায় আধুনিকায়ন চলছে। স্মার্ট সিটির জন্য ফুট ওভারব্রিজ ও রাস্তার পাশে বাগান করা হচ্ছে। উত্তরা দিয়ে ৫ হাজার গাছের চারা রোপণের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী পাঁচ বছর পর সবাই ‘সবুজ ঢাকা’ না বলে পারবেন না। ‘উত্তরা মডেল টাউন’ এতদিন নামেই ছিল। এবার বাস্তবেই মডেল টাউন হবে। ৫টি এলাকা ওয়াইফাই জোন হয়েছে। একটি অ্যাপস্ দেওয়া হচ্ছে। যেখানে কোনো এলাকার সমস্যার ছবি দিলেই সেটা আমার কাছে পেঁৗছুবে। জিআইএস (জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম) কন্ট্রোল রুম করছি। এলইডি বাতিই লাগাব। চোখ ও স্নায়ুর জন্য কিছুটা ক্ষতিকর বলে ধীরেসুস্থে এগোচ্ছি। কারওয়ান বাজার স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। কাঠবিড়ালি পার্ক, প্রজাপতি পার্ক, প্রতিবন্ধীদের জন্য পার্কসহ ২৭টি পার্ক তৈরির উদ্যোগ চলছে। শিশুদের জন্য পার্ক থাকবে। ৬০০ সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। মে মাস থেকেই গুলশান-বনানী এলাকার নিরাপত্তা অনেক শক্তিশালী হবে। এমপি একেএম রহমতুল্লাহর নেতৃত্বে এই কাজটা করছি।
সমকাল :এসব কাজ করতে গিয়ে কোনো সমস্যা হয়েছে?
আনিসুল হক :মেয়রের সীমাবদ্ধতা অনেক। চাইলেই তো ক্ষমতা দেখানো যায় না। এ জন্য ডেকে চাপ সৃষ্টি ও অনুরোধ করতে হয়। তাই মেয়রকে আরও অনেক শক্তি দেওয়া উচিত। তবে আমি নগর সরকারের কথা বলছি না। সমস্ত পুলিশও চাচ্ছি না। একশ’-দুইশ’ পুলিশ চাচ্ছি। ওয়াসার যে অংশ নগরবাসীর জন্য ভোগান্তি তৈরি করে, সেটি চাচ্ছি। অন্য সংস্থার যেসব অংশ নগরীর সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে, সেটা চাচ্ছি।
সমকাল :মেয়রের পদটি অনেকটা রাজনৈতিক। এ কারণে রাজনৈতিক কমিটমেন্ট আমলে নিয়েই মেয়রের কাজ করার রীতি রয়েছে। আপনি রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন। এ কারণে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন?
আনিসুল হক :কোনো সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়নি। পার্টির লোকজনও কখনও বিরক্ত করেনি। বরং কাউন্সিলর ও দলের নেতাকর্মীর সমর্থনের কারণেই অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে, যা মেয়রের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
সমকাল :অতীতে নগর ভবনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি ও ভোগান্তির বিস্তর অভিযোগ ছিল।
আনিসুল হক :এ জন্য ই-টেন্ডার চালু করেছি। আগের মতো ঠিকাদারদের নগর ভবনে ঘুরতে হয় না। তারা ঘরে বসেই টেন্ডার জমা দিচ্ছেন। বিলের জন্য তাদের নগর ভবনে ঘুরতে হয় না। কাজ শেষ হলে চেক পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। করপোরেশনের কর্মীরা যাতে ঠিকমতো কাজ করে, এ জন্য তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। দাবির আগেই তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়েছি। তারা ইন্স্যুরেন্স সুবিধা পাচ্ছেন।
সমকাল :অনেক কাউন্সিলরের স্থায়ী অফিস নেই। তারা অনেক সমস্যার কথা বলেন। কয়েকজন আপনার বিরুদ্ধে জোট গঠনেরও উদ্যোগ নিয়েছেন।
আনিসুল হক :কয়েকজন কাউন্সিলর আমার বিরুদ্ধে কয়েকবার এক জোট হওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। যারা কাউন্সিলর হওয়ার পর টেন্ডারবাজির কথা ভেবেছিলেন, তারাই এমনটা করেছেন। আমি তাদের কাছে মাথা নত করব না।
সমকাল :নতুন যেসব এলাকা ডিএনসিসির আওতাভুক্ত হয়েছে, সেই সব এলাকা নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
আনিসুল হক :এ জন্য নতুন পরিকল্পনায় এগোতে হবে। কারণ ওই এলাকাগুলো তো অনেক পিছিয়ে আছে। সেগুলোর দিকে বেশি নজর দেওয়া হবে।
সমকাল :স্থায়ী নগর ভবন নির্মাণের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
আনিসুল হক :আগামী দুই মাসের মধ্যে গুলশান ২ নম্বরে ইউনাইটেড টাওয়ারে নগর ভবন স্থানান্তর হবে। পরে স্থায়ী নগর ভবন নির্মাণের চিন্তা।
সমকাল :সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?
আনিসুল হক :একেবারেই নয়।
সমকাল : নাগরিকদের উদ্দেশে কিছু বলবেন?
আনিসুল হক :একটি বছর ওয়ার্মআপ করলাম। শহরের কোথায় কী সমস্যা সেগুলো আরও জানার চেষ্টা করেছি। আমাদের জনবলের অনেক অভাব। বর্তমানে প্রয়োজনের ৪২ শতাংশ জনবল দিয়ে চালাতে হচ্ছে। তারপরও একটু হলেও ভিন্ন ঢাকা নগরবাসী দেখতে পাচ্ছেন। আমার ওপর ভরসা রাখুন। পাঁচ বছর পর একটি স্মার্ট সিটি নগরবাসীকে উপহার দিয়ে যেতে পারব।