ফুড কোর্টের উত্তর-পূর্ব কোণে পড়ে আছে ফেনসিডিলের বোতল। উত্তর পাশে বাঁশঝাড়ের নিচে বৃত্ত তৈরি করে নির্দ্বিধায় জুয়া খেলছে কজন। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বেশ কজন অনায়াসে সেবন করছে গাঁজা। সিমেন্টের তৈরি টেবিলগুলোতে ঘুমিয়ে আছে নেশাষক্তরা।

আর ভেতরে-বাইরে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পোকামাকড়ের ভনভন।

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর কামাল আতাতুর্ক সড়কে উত্তর সিটি করপোরেশনের কমিউনিটি সেন্টারের পশ্চিম পাশের প্লটটিতে গড়ে ওঠা ফুড কোর্টটির এই হলো চিত্র। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে এমন চিত্র। উত্তর সিটির প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক বনানী এলাকার অধিবাসীদের জন্য গড়ে তুলেছিলেন তাঁর স্বপ্নের ফুড কোর্ট। ১০ মাস আগে নির্মাণকাজ শেষ হলেও তাঁর স্বপ্নের ফুড কোর্টটি বর্তমানে পরিণত হয়েছে মাদকাসক্তদের আখড়ায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্মাণকাজ শেষ হলেও ফুড কোর্টটি চালু করতে উদ্যোগ নেয়নি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগ। বিষয়টি নিয়ে সংস্থাটির প্রকৌশল বিভাগ সম্পত্তি বিভাগকে একাধিক চিঠি পাঠালেও ফুড কোর্টটি বুঝে নিতে গড়িমসি করছে তারা। মূলত দুই বিভাগের টানাপড়েনে ফুড কোর্টটির এই হাল।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ১৬ শতাংশ জমির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে ফুড কোর্টটি। চারপাশে টিন দিয়ে ঘেরা। দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশে সরু দুটি ফটক। পশ্চিম পাশের ফটক দিয়ে অনায়াসে ফুড কোর্টের ভেতরে প্রবেশ করে মাদক সেবন করছে তরুণরা। আর জুয়াড়িরা বসাচ্ছে জুয়ার আসর। ফুড কোর্টটির দক্ষিণ পাশের ফটকে দোকান বসিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রহরী গাজী মিজানুর রহমান। দোকানের সামনের দিকের সরু রাস্তা দিয়েও অনায়াসে ভেতরে প্রবেশ করা যায়।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মী গাজী মিজানুর রহমান বলেন, ‘মাদকাসক্তদের ব্যাপারে কর্মকর্তাদের অবহিত করেছি। বেশ কবার পুলিশ এসে তল্লাশিও করেছে। আমার পক্ষে সবাইকে আটকানো সম্ভব নয়। ’

প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের স্বপ্নের কথা জেনে বিনা সম্মানীতে ফুড কোর্টটির নকশাসহ যাবতীয় তদারকি করেছে ‘আরবানা’ নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। রাজধানীর বনানী এলাকায় নগরবাসীর জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে খাবারের আয়োজনের পাশাপাশি চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করতে ফুড কোর্টের পরিকল্পনা করেন প্রয়াত মেয়র। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর মেসার্স এসএম কনস্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এর নির্মাণকাজ শুরু করে শেষ করে ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর। ফুড কোর্টটি বুঝে নিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগকে চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি চিঠি দেয় সংস্থাটির প্রকৌশল বিভাগ। কিন্তু সম্পত্তি বিভাগ উদ্যোগ না নেওয়ায় আবার চলতি মাসের ৫ তারিখে ফের চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, সময়ক্ষেপণ হওয়ায় ফুড কোর্টের কোনো ক্ষতি হলে প্রকৌশল বিভাগ সে দায়িত্ব নেবে না। তবে সম্পত্তি বিভাগের দাবি, কোনো ধরনের ক্ষতি হলে তা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বহন করতে হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এসএম কনস্ট্রাকশনের সাইট ইঞ্জিনিয়ার জামাল উদ্দিনের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রকৌশল দপ্তর থেকে যে চিঠি পাঠানো হয়েছিল তাতে কমিটি গঠন নিয়ে একটু সমস্যা ছিল। দ্বিতীয় চিঠিও আমরা পেয়েছি। দ্রুত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

ফুড কোর্টের পূর্ব পাশে বনানী সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় ১৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়। কাউন্সিলর অফিসের পাশে ফুড কোর্টে মাদকাসক্তরা কিভাবে প্রবেশ করে জানতে চাইলে কাউন্সিলর মফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করেছি। খুব শিগগিরই মাদকাসক্তদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

ডিএনসিসির অঞ্চল ৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী এবং ফুড কোর্ট প্রকল্প পরিচালক খন্দকার মাহবুব আলম বলেন, ‘ফুড কোর্ট সম্পত্তি বিভাগের কাছে হস্তান্তর করতে এরই মধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ফুড কোর্ট চালু করতে মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন হবে বলে মনে হয় না। ’

ফুড কোর্টের স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরী বলেন, ‘বনানীর মতো একটি অভিজাত এলাকায় নগরবাসীর চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন প্রয়াত মেয়র। খাবারের দোকান ছিল উপলক্ষ মাত্র। তাঁর পরিকল্পনা শুনেই আমি বিনা মূল্যে এর ডিজাইন করে দেই এবং পুরো কাজের তদারকি করি। মেয়র থাকলে এত দিনে নিশ্চয়ই প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠত প্রতিষ্ঠানটি।

View Source PDF