রাজধানীতে পথচারীদের জন্য হাঁটাপথ তথা ফুটপাথ দ্রুত কমে আসছে। বিশাল বাণিজ্যের লোভে এলাকাভিত্তিক অসাধু সিন্ডিকেট বছরের পর বছর এই হাঁটাপথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। ফলে যাদের জন্য পথের পাশের এই হাঁটাপথ তাদের উপকারের চেয়ে বরং ব্যবসায়ীদের বেশি উপকারে আসছে। মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ ফুটপাথ দখলমুক্ত করার চেষ্টা করলেও কিছুদিন না যেতেই তা আবার দখলে চলে যায়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) পরিসংখ্যান মতে, নগরীর ১৬৩ কিলোমিটার ফুটপাথের মধ্যে ১১৮ কিলোমিটার ফুটপাথই এখন অবৈধ দখলে।ফুটপাথ দখল করে হকার-ব্যবসায়ীরা নানা রকম পণ্য ও খাবারের দোকান বসান। দখলের এই প্রক্রিয়াটি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ফুটপাথে বসানো দোকান এখন ফুটপাথের গণ্ডি পেরিয়ে ব্যস্ত সড়কেও গিয়ে ঠেকেছে। জানা যায়, ঢাকায় প্রায় দেড় লাখ হকার ফুটপাথে ব্যবসা করছেন। আর ফুটপাথের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া প্রভাবশালী মহল ক্ষেত্র ও এলাকাভেদে একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দৈনিক সর্বনিম্ন ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা করে চাঁদা নিচ্ছেন। অভিযোগ আছে, কিছু এলাকার কাউন্সিলর ও সরকারি দল এবং এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতারা এই ফুটপাথের বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত।নগরীর বিভিন্ন মার্কেট, নিউমার্কেট, চাঁদনী চক, বদরুদ্দোজা মার্কেট, মৌচাক মার্কেট ও মিরপুর শাহ আলী মার্কেটের আশপাশের ফুটপাথের দোকানিরা বছরের পর বছর ব্যবসা করছেন। এতে মার্কেটে আসা ক্রেতাদের হাঁটাপথ কমে যায়, ভিড়ে মোবাইল ও মানিব্যাগ চুরির ঘটনা ঘটে। কিছু ক্ষেত্রে নারী-তরুণীদের সঙ্গে বখাটেরা অশালীন আচরণ করে। অথচ এই মার্কেটগুলোর সামনেই টহল পুলিশকে নির্বিকার টহল দিতে দেখা যায়। নিউমার্কেটের এক ফুটপাথ ব্যবসায়ী বলেন, ‘এই জায়গা সরকারের। কিন্তু প্রতিদিন এখানে দোকান বসাইতে পুলিশকে টাকা দিতে হয়।’

একইভাবে নগরীর বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালÑ ঢাকা মেডিকেল কলেজ, পঙ্গু হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের ফুটপাথ দখল করে ওষুধের দোকান, পোশাক, ফলের দোকান, খাবারের দোকান ও বিভিন্ন চিকিৎসা-যন্ত্রপাতিসহ ব্যবসায়ীদের নানারকম পণ্য বিক্রি করতে দেখা যায়। এতে হাসপাতালের সামনের ফুটপাথ দিয়ে আসা রোগী ও তার স্বজনদের যাতায়াতে সমস্যা হয়।

এমনকি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের হাঁটাপথও ব্যবসায়ীরা দখলে নিয়েছেন। ঢাকার বেইলি রোডে ভিকারুনন্নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে দিনভর নানা রকম খাবার, পোশাকসহ যাবতীয় পণ্যের অস্থায়ী দোকান বসে। শাহবাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা       ইনস্টিটিউটের সামনের ফুটপাথ দখল করে কাচের চুরি, মেয়েদের প্রসাধনী পণ্য এবং চটপটিসহ নানা রকম খাবার বিক্রেতাদের বসতে দেখা যায়।

মিরপুর ১০ নম্বর গোলচক্করে সিটি করপোরেশন কার্যালয়ের সামনের হাঁটাপথটিও দীর্ঘদিন ধরে পোশাক ও জুতা     বিক্রেতারা দখলে রেখেছেন। এদের উচ্ছেদ করা হলেও কিছুদিন না যেতেই আবার তারা সেখানে দোকান বসান। উচ্ছেদের দায়িত্বে যারা আছেন তাদের এ ব্যাপারে কোনো মাথাব্যথা নেই।

রাজধানীর ব্যস্ততম সড়ক ফার্মগেটের ফার্মভিউ মার্কেটের আশপাশের ফুটপাথটিও একটি সিন্ডিকেট বছরের পর বছর দখলে রেখেছে। এতে একদিকে যেমন সেই এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয় অন্যদিকে ফার্মগেটে বিভিন্ন পেশাগত কাজে আসা মানুষ ও কোচিং করতে আসা শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা ও হকার নেতাদের যোগসাজশে রাজধানীর ফুটপাথ বাণিজ্য চলছে। অবৈধ দখলদাররা যাতে আবার ফুটপাথ দখল করতে না পারে তার জন্য প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান। আর ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক সম্প্রতি এক গোলটেবিল আলোচনায় বলেন, ফুটপাথ দখলমুক্ত করা তত সহজ নয়। যারা এখানে দোকান বসাচ্ছেন তারা টাকা দিয়েই বসছেন। এর পেছনে রয়েছে ‘শক্ত হাত’। আনিসুল হক আগামী এক মাসের মধ্যে ঢাকার দোকান মালিকদের নির্দিষ্ট স্থানের বাইরে ফুটপাথ ও সড়কের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। আর এই সময়ের মধ্যে কেউ মালামাল না সরালে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

View Source PDF