শ্বাসরুদ্ধকর অপেক্ষার পালা চুকিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনবাসী আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হকের ওপর আস্থা রেখে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে তাঁকে নগরপিতার আসনে বসায়। নির্বাচনের পরদিন গতকাল বুধবার বিকেল ৩টায় কালের কণ্ঠ মুখোমুখি হয় আনিসুল হকের। নতুন মেয়র হিসেবে নগরবাসীর জন্য প্রথম কাজটি কী হবে, কবে নাগাদ তা শুরু করা হবে, সেসব বিষয় একান্ত সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রথম চ্যালেঞ্জ হিসেবে নগরীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মশামুক্ত রাখতে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবেন; দূর করবেন নগর ভবনের দুর্নীতি; সহজ করবেন নগরবাসীর সেবা প্রাপ্তি।

মেয়র নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, নগরীর ভোটার ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি আনিসুল হক। উৎসবমুখর ভোটের দিন বিএনপির নির্বাচন বয়কট করায় মনে কষ্ট পাওয়ার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র প্রার্থী, যাঁদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হেঁটেছেন, পাশাপাশি বসে বক্তব্য দিয়েছেন, তাঁদের প্রতিও শুভ কামনা জানিয়েছেন তিনি।

ঢাকা উত্তরের বাড়িটির সেবক হিসেবে আমাকে নগরবাসী নির্বাচিত করেছে জানিয়ে আনিসুল হক বলেন, ‘মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হওয়া এক নতুন চ্যালেঞ্জ; এক নতুন অনুভূতি। একটি মাস ছুটে বেড়িয়েছি মানুষের ঘরে ঘরে, দুয়ার থেকে দুয়ারে। লাখ লাখ মানুষের হাত ধরা, চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা, নিজের কমিটমেন্ট দেওয়া; মানুষ আমার ওপর আস্থা রেখেছে, আমাকে ভোট দিয়েছে। সেই আস্থার প্রতিদান আমি কাজের মাধ্যমেই দেব। নগরবাসীর সেবক হিসেবে বা নাগরিকের বন্ধু হিসেবে তারা আমাকে নির্বাচিত করেছে। ‘

আপনি বলেছিলেন নির্বাচিত হওয়ার পরদিন থেকেই কাজ শুরু করবেন, আজ নির্বাচনের প্রথম দিন। নগরবাসীর জন্য প্রথম দিন কী কী কাজ করেছেন জানতে চাইলে আনিসুল হক বলেন, ‘নির্বাচিত হওয়ার আগেই আমার কাজ শুরু হয়েছে। ডিএনসিসির যাঁরা কর্মকর্তা আছেন, আমি তাঁদের গতকাল (মঙ্গলবার) রাতেই ফোন করেছি, মেয়রের ফলাফল বের হওয়ার আগে কর্মকর্তাদের আমি বলেছি, নগরীতে একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি আসবেন। মেয়র হিসেবে যিনিই আসুন না কেন, আমি হই আর যে কেউ হোক, আপনারা সেই নির্বাচিত প্রতিনিধির জন্য একটি উপহার দিন। আপনারা আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা শহরের সমস্ত নির্বাচনী পোস্টার-ব্যানার নামিয়ে যতটুকু সম্ভব ঢাকার রাস্তাগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে তুলুন। কাজটা শুরু করুন, যাতে সম্মানিত ভোটাররা বুঝতে পারেন যে, ঢাকাবাসীর সেবা করার জন্য একজন নতুন প্রতিনিধি আসছেন। সেই কাজটি ইতিমধ্যে ডিএনসিসির কর্মকর্তারা শুরু করেছেন। ‘ আনিসুল হক বলেন, ‘নির্বাচিত হওয়ার আগেই আমি একজন নাগরিক হিসেবে ডিএনসিসির কর্মকর্তাদের সেটা বলেছিলাম। আর এখন আমি মেয়র হিসেবে নগরবাসীর সেবক হিসেবে বিষয়গুলো তদারক করব। ‘

নির্বাচিত হওয়ার পর আপনার প্রথম কাজগুলো কী হবে জানতে চাইলে আনিসুল হক বলেন, ‘প্রথম কাজই হবে ঢাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মশামুক্ত রাখা। এসব কাজে নগরবাসীর সহযোগিতা নিয়ে করে যাব। মেয়র হিসেবে এটা আমার নতুন জায়গা। ঢাকা সিটি করপোরেশন কী, কিভাবে চলে, প্রশাসনিক ব্যবস্থা কিভাবে চলে, তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কিভাবে চলে, কিভাবে তাঁরা কাজ করেন- এসব বিষয় বুঝতে কিছুদিন হয়তো সময় লাগবে। এখন আমি চাইলেও হয়তো কাজ শুরু করতে পারব না। সরকারি জিও লাগে, এরপর শপথ নিতে হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করতে হয়তো আরো সাত দিন সময় লাগবে। ‘

আমাদের জরিপে নগরবাসীর প্রধান সমস্যা মশা, অপরিচ্ছন্নতা ও জলাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে জানিয়ে আনিসুল হক বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে অন্য সমস্যাগুলোর সমাধানেও কাজ করে যাব। ডিএনসিসির পাশাপাশি অন্যান্য অর্গানাইজেশনের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ওই সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা, মানুষের চাওয়াগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া, তাদের অসুবিধাগুলো কী তা দূর করাই আমার প্রধান কাজ। ‘

সমস্যায় জর্জরিত ডিএনসিসি নিজেই, কিভাবে এত সমস্যা সমাধান করবেন জানতে চাইলে আনিসুল হক বলেন, ‘এটি একটি বড় সমস্যা। কারণ ডিএনসিসির নিজস্ব কোনো জমি নেই, ভবন নেই। সুতরাং একটি জমি পেয়ে কাজ করতে হলেও অন্তত পাঁচ বছর লাগবে একটি ভবন কিংবা বড় বিল্ডিং করতে। সুতরাং মেয়রের এই অসুবিধাটুকু নিতে হবে। তাঁকে একটি অফিস তৈরি করে যেতে হবে। আর এটা করতে অন্যের কাছ থেকে জমি নিতে হবে, ফান্ড জোগাড় করতে হবে। এক থেকে দেড় বছর লাগবে এটা করতে। দোয়া করবেন, ইনশাআল্লাহ সবই হবে। ‘

নগর ভবনের দুর্নীতি ও টেন্ডারবাজি প্রতিরোধে আপনার ভূমিকা কী হবে? জানতে চাইলে আনিসুল হক বলেন, ‘নগর ভবনের দুর্নীতি বন্ধে জিরো টলারেন্স দেখানো হবে। নগর ভবনে অনেক দুর্নীতি আছে, আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব, সেই দুর্নীতির ডালপালা কেটে দিতে। সবাই মিলে যদি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করি, তাহলে এই দুর্নীতি অনেকাংশে কমবে। ওদেরকেও (দুর্নীতিবাজ) আমাদের বোঝাতে হবে যেন দুর্নীতির বাইরে গিয়ে কাজ করে। একজন দুর্নীতিবাজ লোককে চট করেই সুপথে ফিরিয়ে আনা যায় না। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই দুর্নীতি বন্ধে সচেষ্ট হব। ‘

আপনি তো আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন, সে ক্ষেত্রে দলীয় নেতাদের প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবেন কি না? জবাবে আনিসুল হক বলেন, ‘চাপ এলে তখন বলতে পারব, এখন তো আমি সেই বিষয়ে বলতে পারব না। কারণ কী ধরনের চাপ আসে আমার জানা নেই। কাজ তো কাউকে না কাউকে দিয়ে এবং নিয়েই করতে হবে। একজন মেয়র এক হাতে সব কাজ করবেন না। তবে সেই কাজটিতে যেন স্বচ্ছতা থাকে এবং গুণগতমান বজায় থাকে, সেটা দেখাই হবে আমার অন্যতম কাজ। ‘

View Source PDF