কালের কণ্ঠ : ঢাকা শহরকে অপরিকল্পিত নগর হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। একটি পরিকল্পিত শহর গড়ার ক্ষেত্রে মেয়র হিসেবে আপনি কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন?

আনিসুল হক : আমি সবার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে চাই, ঢাকা কোনো পরিকল্পিত শহর নয়। কারণ হলো, যে সময়ে ঢাকার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, আজকে বিপুল

জনসংখ্যা নিয়ে সেই পরিকল্পনা কোনোভাবেই সমন্বয় করা যাচ্ছে না। বর্জ্য ফেলার জায়গা জানা নেই।

রাস্তায় কত গাড়ি চলবে? ফুটপাতে কত মানুষ হাঁটবে তা চিন্তা করা হয়নি আগে। ড্রেনেজ সিস্টেম পরিকল্পিতভাবে করা হয়নি। তবে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। আমরা এখন পরিকল্পনা করার চেয়ে প্রতিদিনের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি।

কালের কণ্ঠ : আপনার নির্বাচনী ইশতেহারের দেওয়া বিষয়গুলো, যেমন—স্মার্ট, মানবিক, নিরাপদ ঢাকা গড়ার ক্ষেত্রে কতটুকু কাজ করতে পেরেছেন?

আনিসুল হক : আমার মনে হয় কমবেশি সবগুলো জায়গায় হাত দিয়েছি। একটি বছরে অনেক অর্জন হয়েছে তা বলব না। তবে কিছু অর্জন তো হয়েছে। ক্লিন ঢাকা গড়তে বিপুলসংখ্যক বিলবোর্ড সরিয়েছি। এখানে অনেক প্রভাবশালী লোকজন জড়িত ছিল। আমরা পাঁচ মাসের মধ্যে একসঙ্গে ২০ হাজার বিলবোর্ড কেটে ফেলেছি। ক্লিন ঢাকা গড়ার জন্য ৭২টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন করার কাজ শুরু করেছি। এর মধ্যে প্রায় ৫৫টি কাজ শেষ হয়ে। আগামী কয়েক মাস পর রাস্তায় কোনো ময়লা থাকবে না। এ ছাড়া গাবতলী ও তেজগাঁওয়ে পাবলিক টয়লেট করা হয়েছে। এ ধরনের অত্যাধুনিক ১০০ টয়লেট নির্মাণ করা হবে।

কালের কণ্ঠ : ডিএনসিসি এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আপনার উদ্যোগ?

আনিসুল হক : ড্রেনগুলো ময়লায় ভরে সিমেন্টের মতো শক্ত হয়ে গেছে। আমরা ময়লা যথাযথ স্থানে না ফেলার ফলে ড্রেনগুলো ভরে পানি প্রবাহিত হয় না। এসব ড্রেন পরিষ্কার করার কাজে হাত দিয়েছি। এ ছাড়া এ নিয়ে নানা পরিকল্পনা আছে।

কালের কণ্ঠ : যানজট নিয়ে কাজ করা যদিও মেয়রের এখতিয়ারবহির্ভূত তবু নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। এ বিষয়ে আপনি কোনো আশার বাণী শোনাবেন কি?

আনিসুল হক : আমি মেয়র হওয়ার পরপরই যানজট নিয়ে কাজ শুরু করেছি। সবার সহযোগিতায় যানজট কমাতে অনেক কঠিন কাজ করেছি। তেজগাঁও ট্রাক টার্মিনাল, কারওয়ান বাজারের ভেতরের রাস্তা, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড, গাবতলী, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর, মিরপুর-১২, আব্দুল্লাপুর, জাপান বাংলাদেশ কলোনি যাতায়াতের সুব্যবস্থা করেছি। এগুলো কেউ স্বপ্নেও চিন্তা করেনি। যে গাবতলী দিয়ে দেড়-দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় হতো, এখন পাঁচ মিনিটে যাতায়াত করা যায়। এ ছাড়া আমরা যে ইউ লুপ করছি তা বাস্তবায়িত হলে উত্তর করপোরেশন এলাকার যানজট অনেক কমে আসবে।

কালের কণ্ঠ : রাজধানীর গণপরিবহন নিয়ে মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। এ বিষয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

আনিসুল হক : গণপরিবহন নিয়ে আমাদের ব্যাপক চিন্তাভাবনা রয়েছে। আমরা নতুন করে তিন হাজার বাস নামানোর কাজে হাত দিয়েছি। বর্তমানে নগরীতে যে গণপরিবহনব্যবস্থা রয়েছে সেখানে অনেক বড় সিন্ডিকেট রয়েছে। এ সিন্ডিকেটের যারা প্রধান তাদের বাধ্য করেছি; তারা এখন নতুন করে নামানো তিন হাজার বাসের ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে আমাদের নতুন বাস রাস্তায় নামবে।

কালের কণ্ঠ : ডিএনসিসির বেশ কিছু এলাকার রাস্তাঘাটের অবস্থা নাজুক। গত এক বছরে কী পরিমাণ রাস্তা ও ফুটপাত মেরামত হয়েছে?

আনিসুল হক : ডিএনসিসি এলাকায় তিন বছর পর আর কোনো রাস্তা মেরামতের জন্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। গত এক বছরে ১১৮ কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করেছি। ৪৫১টি রাস্তায় গত এক বছরে উন্নয়নের কাজ হয়েছে। ১৪৮ কিলোমিটার ড্রেন সংস্কার হয়েছে। ৬৮ কিলোমিটার ফুটপাত উন্নয়নের কাজ হয়েছে।

কালের কণ্ঠ : ‘স্মার্ট ঢাকা’ বিষয়ে কী কাজ করছেন?

আনিসুল হক : এ বিষয়েও আমরা কাজে হাত দিয়েছি। এরই মধ্যে পাঁচটি জায়গাকে ওয়াই-ফাই জোন ঘোষণা করেছি। সেখানে যে কেউ চাইলে তা ব্যবহার করতে পারবে। আমরা একটি অ্যাপ তৈরি করেছি, যা ১৫ মে আপলোড করব। এটি জিআইএস ও স্যাটেলাইট সিস্টেমে চলবে। এর মধ্যে আমাদের যত সার্ভিস আছে তা নিশ্চিত করতে পারব। আমদের অফিসে থেকে আমরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রাস্তার সার্বিক অবস্থাসহ একপর্যায়ে আমাদের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করব।

কালের কণ্ঠ : রাজধানীর বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। আপনি জলাবদ্ধতা নিরসন ও দখল হয়ে যাওয়া খাল উদ্ধারে কী উদ্যোগ নিয়েছেন?

আনিসুল হক : এটি একটি বড় সমস্যা। স্টর্মড্রেন করার কোনো এখতিয়ার আমাদের নেই। এর পরও বড় বড় পাইপ দিয়ে কাজ শুরু করেছি। কারণ জনগণের বিরূপ মন্তব্য অনেকাংশে আমাদের শুনতে হয়। ড্রেনের কাজে গুণগত মান আদায় করছি। ঠিকাদারদের বিল বাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। কাজের ক্ষেত্রে কোনো আপস নেই।

কালের কণ্ঠ : গ্রিন সিটি নিয়ে আপনি কাজ শুরু করেছেন। ডিএনসিসির পুরো এলাকাকে সবুজ করতে কেমন সময় লাগবে?

আনিসুল হক : আমাদের গ্রিন সিটির কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। আমার ফুটপাত, ফুট ওভারব্রিজ, রাস্তার মাঝখানে গাছ লাগানোর কাজ শুরু করেছি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে ডিএনসিসির প্রায় পাঁচ লাখ গাছ লাগানোর কাজ শুরু হয়েছে।

কালের কণ্ঠ : ‘নিরাপদ ঢাকা’ গড়ার কাজ কতটুকু?

আনিসুল হক : আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম, ৬০০টি সিসি ক্যামেরা বসানোর কাজ করব। আমরা অর্থের জন্য অপেক্ষা করিনি। ক্যামেরার জন্য বন্ধুবান্ধব অর্থ দিয়েছে। এরই মধ্যে ৫০০ ক্যামেরা বসে গেছে। এগুলো খুবই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা। এর ফলে অপরাধীরা ভয় পাবে, আশা করি অপরাধের মাত্রাও কমে আসবে।

কালের কণ্ঠ : সিটি করপোরেশনের নামের সঙ্গে দুর্নীতি শব্দটি চলে আসে। আপনি মেয়র হয়ে কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন কি না?

আনিসুল হক : আমরা প্রথম দিন থেকেই স্বচ্ছতার ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি দিয়েছি। আমি সবাইকে বলেছি—আমরা হয়তো শতভাগ স্বচ্ছ হতে পারব না, তবে যতটুকু সম্ভব তা নিশ্চিত করে যাচ্ছি। প্রথম সময় থেকেই ই-টেন্ডারিং করা শুরু করেছি। এ নিয়ে অনেকেই বাধা-বিপত্তি তৈরি করার চেষ্টা করেছে। আমি এরই মধ্যে দাপ্তরিকভাবে ফাইল তিন দিনের বেশি না রাখার নির্দেশ দিয়েছি। এ ছাড়া মাসে ২০ লাখ টাকার জ্বালানি ব্যয় কমিয়ে এনেছি।

কালের কণ্ঠ : নগরসেবার সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের প্রায় ৫৪টি সংস্থা। এ সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে আপনার কোনো সমন্বয়ের অভাব বোধ করছেন কি না?

আনিসুল হক : অনেকে নগর সরকার নিয়ে কথা বলেন। আমি এ বিষয়ে একমত না। সব দেশের গঠনতন্ত্র এক রকম হয় না। তবে আমি মনে করি, মেয়রকে আরো কিছু ক্ষমতা দেওয়া উচিত সমন্বয়ের জন্য। যেমন—মেয়রকে ১০০ পুলিশ, ওয়াসা, রাজউক, ডেসকো, সড়ক-জনপথের ওপর মেয়রের প্রাশাসনিক কিছু ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন। কেননা, যে যার মতো রাজধানীর সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি করে রাখছে। এভাবে আর কাজ করতে দেওয়া হবে না।

কালের কণ্ঠ : আপনি অনেক আগেই একটি অত্যাধুনিক নগর ভবন নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটা কত দূর?

আনিসুল হক : মেয়রের অফিস নেই বললেই চলে। একেক রুমে পাঁচ-সাতজন কর্মকর্তা বসেন। আমরা একটি ভবনে দুটি ফ্লোর নিয়ে কাজ শুরু করছি। এরপর নতুন ভবন করার ব্যাপারে জায়গা খোঁজা হচ্ছে।

কালের কণ্ঠ : ডিএনসিসির জায়গা, সড়ক-ফুটপাত কতটুকু দখলমুক্ত করতে পেরেছেন?

আনিসুল হক : আমার রাস্তাঘাটসহ কারওয়ান বাজার দখলমুক্ত করেছি। কিন্তু কিছু খাল এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আমরা এখনো সব তথ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারিনি। দখলের তথ্য সংগ্রহ করার কাজ চলছে।

কালের কণ্ঠ : ঢাকার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে মেয়রের ভূমিকা আছে কি?

আনিসুল হক : মেয়রের কিছু এখতিয়ার থাকা খুবই জরুরি। রাজউক মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে মেয়রদের সঙ্গে যোগাযোগ করে না। আমাদের একটি পরিকল্পনা বিভাগ থাকলেও রাজউক সমন্বয় করছে না।

কালের কণ্ঠ : আপনাকে ধন্যবাদ!

আনিসুল হক : কালের কণ্ঠকেও ধন্যবাদ

View Source PDF