রাজধানীর তেজগাঁওয়ে রেলের জমিতে গড়ে ওঠা ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদের সময় গতকাল রবিবার পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়েছে। কয়েক দফা নির্দেশনার পর গতকাল দুপুরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা ট্রাকস্ট্যান্ড থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান শুরু করলে শ্রমিকরা মারমুখী হয়ে ওঠে। তারা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে, গাড়ি ভাঙচুর করে, সড়কে টায়ার ফেলে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং রাস্তা অবরোধ করে রাখে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ রাবার বুলেট, টিয়ার গ্যাসের শেল ও ছররা গুলি ছোড়ে।
অভিযান পরিদর্শনে গিয়ে মেয়র আনিসুল হক ও রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক এ সময় কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তাঁরা বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়নের কার্যালয়ে অবস্থান নেন। রেলমন্ত্রী কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থল ছাড়লেও বিকেল প্রায় ৫টা পর্যন্ত মেয়র ঘটনাস্থলে ছিলেন। পরে পুলিশ ও র্যাবের পাহারায় তিনি ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এর আগে শ্রমিকদের আরো ভালো মানের টার্মিনাল নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে যান। তাঁর বত্তৃদ্ধতার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। তবে শ্রমিকদের বাধা ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মুখে গতকাল আর অভিযান পরিচালনা করা যায়নি।
গতকাল রাজধানীর তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার সময় উত্তেজিত শ্রমিকদের শান্ত করার চেষ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক
তেজগাঁও সাতরাস্তা এলাকা থেকে কারওয়ান বাজার লেভেলক্রসিং পর্যন্ত টার্মিনালের বাইরে অবৈধভাবে ফেলে রাখা পুরনো ট্রাক ও বিভিন্ন স্থাপনা সরাতে বেশ কিছুদিন ধরেই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মালিক-শ্রমিকদের সতর্ক করা হচ্ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড থেকে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে মালিক-শ্রমিকদের কয়ক দফা নির্দেশনা দিয়েছিল। এ বিষয়ে বেশ কিছুদিন ধরে প্রচার চালায় সিটি করপোরেশন। সর্বশেষ গত শুক্রবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। তবে সর্বশেষ সময়সীমাও মানেনি বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়ন। নির্ধারিত সময়ের পর গতকাল দুপুরে ট্রাকস্ট্যান্ডের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান শুরু করলে একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। স্থানীয় শ্রমিকরা সিটি করপোরেশনের অভিযানে বাধা দিয়ে ইট-পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে এবং টায়ারে আগুন ধরিয়ে দিয়ে রাস্তা অবরোধ করে রাখে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গেলে শ্রমিকরা পুলিশের ওপরও হামলা চালায়। একপর্যায়ে পুলিশ রাবার বুলেট,
টিয়ার গ্যাসের শেল ও ছররা গুলি ছুড়তে শুরু করে। এতে জসিম উদ্দিন নামের এক কাভার্ড ভ্যানচালক আহত হন। আহত শ্রমিকের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত করে তোলে শ্রমিকরা। এ সময় গণমাধ্যমকর্মীরাও বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের রোষানলে পড়েন। এভাবে দুপুর পৌনে ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পুরো তেজগাঁও এলাকা অশান্ত হয়ে ওঠে। আর এর প্রভাবে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজট ছড়িয়ে পড়ে।
বিক্ষোভের একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে যান রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। -ছবি : কালের কণ্ঠ
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সামছুল ইসলাম মেহেদির নেতৃত্বে দুপুর ১টার দিকে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদের অভিযান শুরু হয়। এ সময় সিটি করপোরেশনের নির্দেশ অমান্য করে জসিম উদ্দিন নামের এক চালক রাস্তায় কাভার্ড ভ্যান রেখে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ও ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আনিসুল হকের উপস্থিতিতে অন্য শ্রমিকরাও এ রকম বেয়াড়া আচরণ করতে থাকে। একপর্যায়ে মেয়র চালক জসিমকে ৩০ মিনিট সময় দিয়ে কাভার্ড ভ্যানটি ট্রাকস্ট্যান্ড থেকে সরিয়ে নিতে অনুরোধ জানান। নির্ধারিত সময়েও চালক জসিম কাভার্ড ভ্যানটি না সরালে ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে রেকার লাগিয়ে কাভার্ড ভ্যানটি সরানোর মধ্য দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেন সিটি করপোরেশনের কর্মীরা। এর কিছুক্ষণ পর স্থানীয় শ্রমিকরা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনাকারীদের লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইট-পাথর ছুড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে এক চালক আহত হন। পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ইট-পাথর নিক্ষেপের পাশাপাশি লাঠিসোঁটা নিয়ে শ্রমিকরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এ সময় মেয়রের প্রটোকলের গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। এ ছাড়া শ্রমিকরা চ্যানেল আইয়ের গাড়ি ভাঙচুর করে এবং তাদের হামলায় বিডিনিউজের একজন ফটোসাংবাদিককে আহত হন।
এ সময় মেয়র ও মন্ত্রী বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়ন অফিসের ভেতর কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর মন্ত্রী ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে সেখানে র্যাব ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিকেল পৌনে ৫টার দিকে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় মেয়র আনিসুল হক ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
এর আগে মেয়র শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘যে জায়গা দখল করা হয়েছে তা রেলওয়ের জায়গা। এসব জায়গা ভালোভাবে ব্যবহার হচ্ছিল না। মালিকপক্ষ বলেছে, ভেতরে জায়গা করে দেন। আমরা জায়গা করে দিয়েছি। দুই মাস এ নিয়ে কাজ করেছি। এখন অনেক ক্লিয়ার হয়ে গেছে। যাঁরা অবৈধ দখল করে আছেন, আপনাদের সুবিধার জন্য এসব করা হচ্ছে। আপনাদের গাড়ি যাতে ভালোভাবে বের হতে পারে সে জন্য এ রাস্তা খালি করা হচ্ছে। আমার সুবিধার জন্য নয়। ’
মেয়র বলেন, ‘আপনারা আমাকে ভোট দিয়ে মেয়র বানিয়েছেন। আমি আপনাদের ছেলে। আপনারা আমাদের সহযোগিতা করুন। আমরা আপনাদের জন্য ভালো টার্মিনাল তৈরি করব। ’ তিনি বলেন, ‘আজ যে সমস্যাটা শুরু হয়েছে, তা ছোট্ট একটা সমস্যা। এখানে রাস্তায় পার্কিং না করে আমরা ভেতরে টার্মিনাল বানাব। রাস্তার ওপর ট্রাকগুলো ভেতরে ঢুকবে। ’
শ্রমিক আহত হওয়ার ব্যাপারে আনিসুল হক বলেন, ‘নাগরিকদের ভোটেই আমি মেয়র হয়েছি। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমার সাথে ঢাকাবাসী রয়েছে। যদি সে (শ্রমিক) আহত থাকে, তাহলে আমি তাকে দেখব। এখন ঠিক হলো যে, আপনারা রাস্তায় গাড়ি না রেখে তা ভেতরে রাখবেন। আসুন ঢাকা শহরকে পরিষ্কার করি। ’
এর আগে অবরুদ্ধ অবস্থায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মেয়র পরিবহন শ্রমিকদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘যারা মাস্তানি করছে, তাদের বলছি, এসব মাস্তানি চলবে না। আমাকে ঢাকা শহর গড়ার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমার পেছনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মানুষের সমর্থন আছে। ঢাকাবাসী আমাদের ওপর আস্থা রেখেছেন। আমাদের সঙ্গে কাউন্সিলররা আছেন। ঢাকা শহরে এসব অবৈধ কাজ হবে না। শহরের মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে চলতে পারে সেই কাজ করছি। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কেউ উত্তেজিত করলেন, আর আমি আমার লোক নিয়ে দৌড়ে চলে গেলাম, এটা হবে না। কিছু স্বার্থপর লোকের কারণে এসব হচ্ছে, আমরা তাদের চিনি। আমরা এসব মেনে নেব না। একটাই চাওয়া মেয়রের, রাস্তায় গাড়ি পার্কিং করবেন না। ঢিল মারলে আমার মাথা ফাটবে। আমি সব বুঝেই এসেছি। ’
বিকেল ৪টার দিকে স্থানীয় মহিলা কাউন্সিলরের নেতৃত্বে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে একটি মিছিল ঘটনাস্থল ট্রাকস্ট্যান্ডের দিকে আসতে থাকে। ওই সময় উচ্ছৃঙ্খল কিছু যুবক তাদের ধাওয়া দেয় এবং অশ্লীল আচরণ করে।
বিকেল সোয়া ৪টার পর একাধিক শ্রমিক নেতা উত্তেজিত শ্রমিকদের উদ্দেশে মাইকে ঘোষণা দেন, ‘অপনারা স্ব-স্ব অবস্থানে চলে যান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের কার্যক্রম গ্রহণ করবে। ’ শ্রমিক নেতা তালুকদার রনি ও হুমায়ুন আহম্মেদের নেতৃত্বে মাইকে এ ঘোষণা দেওয়ার পর বিকেল পৌনে ৫টার দিকে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
পরিস্থিতি শান্ত হলে বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি রুস্তম আলী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরাও এই উচ্ছেদের পক্ষে। মেয়রকে আমরাও সহযোগিতা করতে চাই। এখানে অনেক পক্ষ জড়িত। শ্রমিক, চালক ও মালিকদের বেশির ভাগই এ উচ্ছেদের পক্ষে। তবে হাতেগোনা কয়েকজনের উসকানিতে এ ধরনের ঘটনা ঘটল। ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্যই এ হামলা হয়েছে। ’
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ঘটনার শুরু থেকেই ওই এলাকায় উপস্থিত ছিলেন। পরিস্থিতি শান্ত হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুলিশ ধৈর্যের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ মোকাবিলা করেছে। শ্রমিকরাও আমাদের সহযোগিতা করেছে। ’
হাসপাতাল সূত্র জানায়, আহত ট্রাকচালক জসিম উদ্দিনকে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাবার বুলেটের পাশাপাশি জসিম উদ্দিনের শরীরের বিভিন্ন অংশে ছররা গুলির চিহ্ন রয়েছে। আর আহত ফটো সাংবাদিকের মাথায় ব্যান্ডেজ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডটি রেলওয়ের জমিতে গড়ে উঠেছে। এই ট্রাকস্ট্যান্ডকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় গড়ে উঠেছে অবৈধ দোকানপাট। রয়েছে পুরনো ও বিকল ট্রাকের স্তূপ। ট্রাকস্ট্যান্ডের ভেতরে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক মেরামত কারখানা। এসব দোকানের যন্ত্রাংশ, অব্যবহৃত ও বাতিল জিনিসপত্র পুরো স্ট্যান্ডকে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত করেছে। রাস্তাজুড়ে সারি সারি ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান রাখা হয়েছে। এর ফলে সাতরাস্তা থেকে তেজগাঁও রেললাইন পর্যন্ত যানজট লেগেই থাকে। সেই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই এলাকাটি সন্ত্রাসীদের দখলে। চাঁদাবাজি ও ছিনতাইকারীরা এ এলাকায় উঠাবসা করে।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, এ ঘটনার আগে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড দখলমুক্ত করতে কয়েক দফা শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন মেয়র আনিসুল হক। গত ১ নভেম্বর রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক ও ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির নেতাদের নিয়ে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকা পরিদর্শন করেন মেয়র। তখন তিনি শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ৭ নভেম্বরের মধ্যে তেজগাঁওয়ে রেলের জায়গার অবৈধ স্থাপনা না সরালে ৮ নভেম্বর সেগুলো উচ্ছেদ করা হবে। সর্বশেষ ৭ নভেম্বর পর্যন্ত শ্রমিক নেতাদের সময় বেঁধে দেওয়ার পরও ট্রাক না সরালে মেয়র ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। মালিক সমিতি মেয়রকে আশ্বাস দিয়েছিল নিজেরা সড়ক থেকে ট্রাক সরিয়ে নেবে ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করবে। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষে গতকাল রবিবার উচ্ছেদ অভিযানে এসে মেয়র দেখেন, রাস্তা থেকে বেশির ভাগ ট্রাক সরিয়ে নেওয়া হলেও কিছু গাড়ি এখনো ফেলে রাখা হয়েছে।

