ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বাকি মাত্র একদিন। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে সিটি নির্বাচন। এর মধ্যে গতকাল ইডবি্লউএমজিএল কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত হয় ‘কেমন মেয়র হবো’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক। বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম-এর সঞ্চালনায় বৈঠকে অংশ নেন মেয়র পদপ্রার্থী, বিশিষ্টজন ও নগর পরিকল্পনাবিদরা। বৈঠকে বক্তাদের আলোচনায় উঠে আসে ঢাকা নগরীর নানা সমস্যার চিত্র। বিশেষজ্ঞরাও তুলে ধরেন মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে মেয়রের ভূমিকা। বিস্তারিত তুলে ধরেছেন- গোলাম রাব্বানী, আলী রিয়াজ, রফিকুল ইসলাম রনি ও লাকমিনা জেসমিন সোমা । ছবি : রোহেত রাজীব

যারা অংশ নিলেন

আনিসুল হক, মেয়র প্রার্থী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন

তাবিথ আউয়াল, মেয়র প্রার্থী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন

বাহাউদ্দিন আহমদ বাবুল, মেয়র প্রার্থী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন

আবদুল্লাহ আল ক্বাফী, মেয়র প্রার্থী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন

জোনায়েদ সাকি, মেয়র প্রার্থী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন

নাদের চৌধুরী, মেয়র প্রার্থী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন

মাওলানা শেখ মোহাম্মদ ফজলে বারী মাসউদ, মেয়র প্রার্থী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন

আনিসুজ্জামান খোকন, মেয়র প্রার্থী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন

মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ, মেয়র প্রার্থী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন

কাজী শহীদুল্লাহ, মেয়র প্রার্থী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন

সাঈদ খোকন, মেয়র প্রার্থী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন

বজলুর রশীদ ফিরোজ, মেয়র প্রার্থী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন

শহীদুল ইসলাম, (সদ্য সরে দাঁড়ানো) মেয়র প্রার্থী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন

্আলহাজ আবদুর রহমান, মেয়র প্রার্থী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন

বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুজন

ড. তোফায়েল আহমেদ, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ

স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন, নগর পরিকল্পনাবিদ

মেজর জেনারেল মোহাম্মাদ আলী শিকদার (অব.), নিরাপত্তা বিশ্লেষক

ইমদাদুল হক মিলন, সম্পাদক, কালের কণ্ঠ

সঞ্চালক : নঈম নিজাম, সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

আনিসুল হক : যে ব্যক্তি নগর উন্নয়নে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারবে, প্রয়োজনে লড়তেও পারবে, তারই মেয়রের আসনে বসা উচিত। আমি সৎ এবং অভিজ্ঞ। আমি অতীতে অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করেছি। তাই মেয়র নির্বাচিত হলে নগরবাসীর জন্য উন্নত ঢাকা গড়তে যা করা দরকার তাই করব। ঢাকাকে সিঙ্গাপুরের মতো সুন্দর নগরী করা অসম্ভব নয়। এর জন্য দরকার শুধু পরিকল্পনা করে সেই মোতাবেক পথ চলা। এমন ঢাকা গড়ার প্রত্যাশায়ই আমি ডিসিসি নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। ঢাকা একটি বড় কারখানার মতো, ছোটখাটো একটা রাষ্ট্রের মতো। এর প্রশাসনিক শাখা-প্রশাখা ও কর্মগণ্ডী অনেক বড়। ৫৪টি সংস্থার সঙ্গে ডিসিসিকে সমন্বয় করতে হয়। তাই এটা চালাতে অভিজ্ঞ লোক দরকার। আমার সেই অভিজ্ঞতা একটু হলেও আছে। ডিসিসি মেয়রের হাতে জাদুর চেরাগ নেই। উল্টো যেটুকু চেরাগের আলো জ্বলছে তা নেভানোর মানুষ আছে অনেক। এসব বুঝেই ঢাকার মেয়রকে সামনে এগোতে হবে। আমার স্বপ্ন আছে। পরিকল্পনামাফিক পাঁচ বছরের মধ্যে ঢাকার চেহারা বদলে ফেলা সম্ভব। আমি মেয়র হলে সেই চেষ্টাই করব। আমরা মোটামুটি সবাই ঢাকার সমস্যার কথা জানি। শুধু পরিকল্পনা অনুযায়ী সেগুলো বাস্তবায়নের পালা। তবে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘কোয়ালিটি’ মেনে চলতে হবে। একটি কাজ একদিনেও করা যায়, এক বছরেও করা যায়। কীভাবে মানসম্মত সেবা দেওয়া যায় সেটি লক্ষ্য রাখা জরুরি।

তাবিথ আউয়াল : সিটি করপোরেশন নিজেই যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয় তাহলে কোনোভাবেই নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সিটি করপোরেশনকে দুর্নীতিমুক্ত করাই হবে আমার প্রথম কাজ। মানুষের সেবার চাহিদা এখন আগের মতো নেই। এটা অনেক বেড়েছে। তাই সেবার মানও বাড়াতে হবে। আগের জায়গায় আটকে থাকলে হবে না। ঢাকায় ৫০ ভাগ নারী। এর মধ্যে অনেক বড় একটি অংশ নারী কর্মজীবী। ঢাকাকে নারীবান্ধব করে গড়ে তোলা হবে আমার অন্যতম কাজ। নারীদের নিরাপত্তা এখানে হুমকির মুখে। নিরাপত্তা বাড়াতে যা যা করণীয় তাই করব। রাজধানীতে গণপরিবহনও একটি বড় সমস্যা। তাই এটা আমার নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম একটি বিষয়। বাসের সংখ্যা ও মান দুই-ই বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে আমার কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচনের মাঠে নেমে দেখেছি মানুষ অসংখ্য অভিযোগ নিয়ে আসছে। যেগুলো নিয়ে আসছে তা সমাধানের দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সরকারের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব এত বেড়ে গেছে যে তারা বুঝতে পারছেন না কার কাছে যাবেন। কার কাছে এসব সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে। আমি মেয়র হলে জনগণের সঙ্গে সেই দূরত্ব তৈরি হতে দেব না। মেয়র হিসেবে যতখানি করা সম্ভব তা করব। শিশু, তরুণ, বৃদ্ধ সবাইকে সমান গুরুত্ব দিয়েই তাদের জন্য কাজ করব। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তথা পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তুলব।

নঈম নিজাম : ঢাকা নগরের উন্নয়নে বিভিন্ন সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা চরম আকার নিয়েছে। এ সমন্বয়হীনতা কাটিয়ে ঢাকার উন্নয়নে ঢাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে সরকারের সঙ্গে লড়াই করে কাজ বাস্তবায়ন করতে পারবেন এমন একজনকেই মেয়র হিসেবে আমরা দেখতে চাই। ঢাকার অনেক ধরনের সংকট রয়েছে। মোগল আমলে গড়ে ওঠা এই ঢাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বার বার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। মেট্রো সরকারের দাবি অনেক আগেই করা হয়েছে। সাবেক মেয়র প্রয়াত মোহাম্মদ হানিফ, সাদেক হোসেন খোকা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছেন ঢাকা নগরীর উন্নয়ন করতে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বেড়েছে ঢাকার আয়তন। এখন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকার উন্নয়নে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। এখনো জনগণের দাবি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আমরা চাই এমন এক বলিষ্ঠ নেতৃত্ব যিনি সিটি করপোরেশন দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে পারবেন। সরকারের কাছে সব দাবি আদায় করে নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণে নিজেকে নিয়োজিত রাখবেন। ঢাকা সিটির সমস্যাগুলো অনেক আগেই চিহ্নিত হয়েছে। দুঃখের বিষয় সৎ, যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে সংকট উত্তরণ হয়নি। আমরা আশা করব, মেয়র নির্বাচিত হয়ে তিনি সব সংকট দূর করে দেবেন এমন নয়; তবে তিনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ যেন নিতে পারেন।

ইমদাদুল হক মিলন : সিটি করপোরশনের পরিবর্তন করতে হলে এর খোলনলচে পাল্টাতে হবে। পুরো নগর কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে। এই কাঠামোর মধ্যে কোনো ধরনের উন্নয়ন সম্ভব নয়। মেয়র প্রার্থীরা আসবেন, বসবাসযোগ্য ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি দেবেন, এটা করবেন, ওটা করবেন- এভাবে বদলাবে না। সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন সম্পর্কিত কয়েকটি কমিটির সঙ্গে আমি ছিলাম। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কমিটি সুপারিশ করেছে। কমিটির বৈঠকে এসব সুপারিশ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরের দিন থেকেই দেখি সেসবের কিছুই করা হয় না। পুরনো সেই পদ্ধতিতে কাজ চলছে। আমরা সাজেশন দিয়ে আসি কিন্তু কোনো কাজ হয় না। তিনি বলেন, আমরা অস্বস্তিকর ঢাকায় বসবাস করি।

আমরা একটি স্বস্তির ঢাকা চাই। যিনি মেয়র হবেন তিনি যেন স্বস্তি দেন ঢাকাবাসীকে। এমন একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নেতা চাই যিনি স্বস্তিকর ঢাকা গড়ে তুলবেন। যে ঢাকায় মানুষ নিশ্বাস নিতে পারবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সব ধরনের নাগরিক সুবিধা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। ঢাকা মানে দক্ষিণ ঢাকা। দক্ষিণ ঢাকার উন্নয়ন করতে না পারলে পুরো ঢাকাই ঢাকার মতো দাঁড়াবে না। এখানে জীবনের নিরাপত্তা নেই। সম্পদের নিরাপত্তা নেই। রাস্তায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। যানজট অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এতসব সমস্যার মধ্যেও মেয়রকে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

সাঈদ খোকন : আমি মেয়র হলে নগরভবন হবে নগরবাসীর সেবাকেন্দ্র, এটাকে দলীয় কার্যালয় বানাতে দেব না। আমি মনে করি, রাজনীতি যার যার, মেয়র হবে সবার। যিনি মেয়র নির্বাচিত হবেন তিনি দল-মত নির্বিশেষে সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়েই নগরীর উন্নয়নে কাজ করবেন। একজন নির্বাচিত মেয়রের কাছে নগরবাসীর প্রত্যাশা অনেক বেশি। বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস- সব সমস্যায়ই তারা মেয়রের কাছে ছুটে আসেন। যদিও মেয়রের ক্ষমতা একটা নির্দিষ্ট কর্মপরিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ, তবে জনগণের ভোটে যে মেয়র ক্ষমতায় আসেন তিনি ইচ্ছা করলে অনেক কিছুই করতে পারেন। জনসমর্থনই তার বড় হাতিয়ার। ঢাকার সমস্যা বের করব এবং তাদের নিয়েই সমাধানের চেষ্টা করব। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নিয়ে ‘ঢাকা ডায়ালগ’-এর আয়োজন করব।

বজলুর রশীদ ফিরোজ : বিশ্বের অন্যতম সেরা জনবহুল শহর ঢাকা। এই শহরে সমস্যার যেন শেষ নেই। ঢাকা শহরকে পরিচালনার জন্য রয়েছে ঢাকা সিটি করপোরেশন। কিন্তু এই সিটি করপোরেশন নানা কারণে নগরবাসীকে সুষ্ঠু সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। আমি মেয়র হলে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুর্নীতিমুক্ত করব। ঢাকাবাসীর সেবা নিশ্চিত করব। দুর্নীতিমুক্ত সিটি গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাব। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এখনো কার্যকর হয়নি। এ লক্ষ্যে কাজ করা হবে। বজলুর রশীদ ফিরোজ আরও বলেন, সিটি করপোরেশনে যে পরিমাণ লোক নিয়োগ দেওয়া আছে সে পরিমাণ সেবা জনগণ পাচ্ছেন না। সিটি করপোরেশনের লোকেরা সঠিকভাবে কাজ করছেন না। নির্বাচিত হলে কাউন্সিলর এবং বিশিষ্টজনদের নিয়ে কমিটি গঠন করে সমস্যা নির্ণয় করে তা সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করা হবে। সেবা জনগণের দোরগড়ায় দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, ঢাকা শহর যানজটের নগরীতে পরিণত হয়েছে। এটি সমাধানের লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

বিরাজমান সমস্যা সমাধানে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হবে। বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ঢাকা শহরে পরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নতি করা হবে। শহরকে আরও পরিষ্কার করার লক্ষ্যে উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আমি নির্বাচিত না হলেও জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবির পক্ষে কাজ করে যাব। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা নগরের সমস্যা দূর করে আধুনিক নগরে পরিণত করব।

জোনায়েদ সাকি : গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী জোনায়েদ সাকি বলেছেন, মেয়র হলে আমার প্রথম কাজ হবে নাগরিকদের সেবা নিশ্চিত করা এবং হয়রানি বন্ধ করা। আজও ঢাকার অনেক নাগরিকের বাসার হোল্ডিং নম্বর নেই। যাদের আছে তারা সেবা পাচ্ছেন অন্যরা পাচ্ছেন না। অন্যদিকে বস্তিবাসীর বাসার হোল্ডিং নম্বর নেই। আমি মেয়র হলে বস্তিবাসীসহ সব নাগরিকের বসবাসের জন্য হোল্ডিং নম্বরের ব্যবস্থা করব। জোনায়েদ সাকি বলেন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় গিয়ে নাগরিকরা সহযোগিতা পাওয়ার বদলে হয়রানির শিকার হন। সুযোগ-সুবিধা পেলে তারা নগরকে সুন্দর করতে সহায়তা করবে। তিনি বলেন, ঢাকা উত্তর সিটিতে বস্তি বেশি। হোল্ডিং নম্বর না থাকায় তারা হোল্ডিং ট্যাক্স দেন না। নাগরিক সুবিধাও পান না।

তিনি আরও বলেন, ঢাকায় নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হবে। আজও ঢাকায় বসবাসকারী অনেক শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত হয়নি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) ফান্ড থেকে অর্থ নিয়ে অনায়াশে ১০০ স্কুল প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। ঢাকায় বহু পথশিশু থাকে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেব। একটি শিশু ও নারীবান্ধব আদর্শ ঢাকা নগর গড়ে তোলার জন্য আন্তরিক চেষ্টা করব।

এ ছাড়াও গণপরিবহন ব্যবস্থাকে অন্যতম নাগরিক সংকট উল্লেখ করে জোনায়েদ সাকি বলেন, সিটি করপোরেশনকে দুর্নীতি, আবর্জনামুক্ত করা হবে। গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করা হবে।

বদিউল আলম মজুমদার : সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আসন্ন সিটি নির্বাচনে এমন একজন মেয়র চাই, যিনি পেশাদারিত্বমূলক নেতৃত্ব দেবেন। তার সিটি করপোরেশনকে শতভাগ পেশাদারিত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত করবেন এবং জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়াবেন। স্থানীয় সরকার হচ্ছে জনগণের দোরগোড়ার সরকার। সেই মেয়র যেন কাউন্সিলরদের দাবি নিয়েও কাজ করেন। মোটকথা জনগণকে সম্পৃক্ত করতে যা যা করা প্রয়োজন তাই করবেন। সিটি গভর্নমেন্ট বা নগর সরকার করা প্রয়োজন। এ জন্য যারা মেয়র নির্বাচিত হবেন, তারা যেন বিষয়টিকে গণদাবিতে পরিণত করেন। তাহলে স্থানীয় সরকার আরও বেশি শক্তিশালী হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে।

নাদের চৌধুরী : আমি মেয়র হলে আগামী ১০ বছরে ঢাকা সিটিতে কোনো নতুন মার্কেট হতে দেব না। অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র এসব মার্কেট গড়ে ওঠাতেই রাজধানীতে যানজট আজ অসহনীয় রূপ নিয়েছে। যেসব মার্কেট বর্তমানে আছে সেগুলোর পার্কিং ব্যবস্থাও নেই। সেগুলোর পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। না হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলীয় প্রভাবের কারণেই সিটির সমস্যা যাচ্ছে না। ঢাকায় মান্ধাতা আমলের বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা। আর এগুলো রাজনৈতিক নেতারা নিয়ন্ত্রণ করেন। এ কারণে এগুলো বদলে নতুন আনা হচ্ছে না। দুর্নীতি ও দলীয় প্রভাবমুক্ত সিটি করপোরেশন গড়তে চাই। মিনি পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা করব। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিয়ে ৩০/৩৫ সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করব। তাদের মতামতের ভিত্তিতে নগর উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব।

আবদুল্লাহ আল ক্বাফী : তারুণ্যের শক্তিকে পুনর্জাগরণ ঘটিয়ে নিজের সর্বোচ্চ মেধা শ্রম দিয়ে সিটি করপোরেশন গড়ে তুলতে আত্দত্যাগ করব। বাসযোগ্য মানবিক ঢাকা নগর গড়ে তুলতে আমার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং সেবা দেওয়ার মন-মানসিকতা নিয়ে সর্বক্ষণ কাজ করব। মেয়র নির্বাচিত হলে ঢাকার সব কাউন্সিলর অফিসকে সেবাকেন্দ্রে পরিণত করব। কাউন্সিলরদের কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষ চায় নিরাপদ আবাসন। উৎপাদনশীল শিল্পপতি ব্যবসায়ীরা চান চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশ।

সবুজ পরিবেশবান্ধব ঢাকা নগরকে সব শ্রেণির মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার নগর হিসেবে গড়ে তোলাই হবে আমার কাজ। গণতান্ত্রিক নগর প্রশাসন গড়তে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে প্রতি মাসে অন্তত একটি গণশুনানি করে নগর প্রশাসনকে মানুষের কাছে নিয়ে যাব। সব মানুষের জন্য আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করব। আমি নির্বাচিত হলে নগর সরকার প্রতিষ্ঠা করতে আন্দোলন চালিয়ে যাব। কাউন্সিলরদের নিয়ে সংসদের আদলে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।

৭১ দফার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে মানুষের কাছে যাচ্ছি এবং হাতী প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করছি।

আনিসুজ্জামান খোকন : ঢাকা বিশ্বের অন্যতম বড় শহর। এখানকার জনসংখ্যা দেড় কোটি। পৃথিবীর অনেক ক্ষুদ্র রাষ্ট্র আছে যার লোকসংখ্যা ঢাকার চেয়ে কম। এ শহরে কর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসে। কিন্তু ঢাকা আজও পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে উঠেনি। তাই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে একজন যোগ্য মেয়র হিসেবে কাজ করতে চাই। আমি নির্বাচিত হলে ঢাকাকে বিশ্বসেরা শহরে পরিণত করব। বিশ্বের বৃহৎ নগরগুলো কীভাবে আজ এই অবস্থানে এসেছে। নিউইয়র্ক, বার্লিনসহ বড় বড় শহরের ব্যবস্থাপনা কীভাবে করে সেটাকে ঢাকা মহানগরকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায়। তারা যদি একটি পরিচ্ছন্ন নগর গড়তে পারে আমরা পারব না কেন?

তিনি বলেন, আমি নিউইয়র্কে ছিলাম ৩০ বছর। নিউইয়র্কে রূপসী বাংলা টেলিভিশন করেছি। সেখানে রাষ্ট্রপতিসহ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আমার কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। তারা কীভাবে প্রশাসন চালান তা আমি জানি। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন সংসদের এমপি ছিলাম। এই অভিজ্ঞতা থেকে দেশের মানুষের সেবা করতে এসেছি। আমি মেয়র নির্বাচিত হলে ঢাকা নগরকে বিশ্বমানের নগর হিসেবে গড়ে তুলতে পারব। ঢাকা আধুনিক বাসযোগ্য নগর হয়ে উঠবে।

মেজর জেনারেল মোহাম্মাদ আলী শিকদার (অব.) : ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আদর্শবান মেয়র চাই। ঢাকা সিটিতে অনেক প্রতিকূলতা আছে। এই প্রতিকূলতা নিয়ে কাজ করতে হয় মেয়রদের। কোন সময়ে কোন কাজটি করতে হবে এটার কোনো পরিকল্পনা নেই। রাজনীতিক প্রভাবে অনেক কাজে গতি থাকে না। যিনি মেয়র হবেন তিনি যেন এই প্রতিকূলতা কাটিয়ে শক্ত হাতে পদক্ষেপ নিতে পারেন।

তার যদি আদর্শ না থাকে তাহলে দুর্নীতি ঠেকাতে পারবেন না। আর দুর্নীতি ঠেকাতে না পারলে কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা যাবে না। নির্বাচিত মেয়রকে সীমিত সম্পদের নাগরিক চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করতে হবে। গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

বাহাউদ্দিন আহমদ বাবুল : মেয়র নির্বাচিত হলে হুকুমের নয়, কাজের রাজা হবো। স্থানীয় সরকারে কোনো কাজ করতে গেলে তার গতি থাকে না। স্থানীয় সরকার প্রশাসন বলা হলেও দুর্নীতির কারণে কোনো কাজ করা সম্ভব হয় না। নিজের আয় থেকে চলার মতো ব্যবস্থা নেই। ঢাকা উত্তরের তিন দিকে তুরাগ ও বালু নদী বেষ্টিত। তুরাগ পারে প্রায় কোটি মানুষ বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নেন। কিন্তু তুরাগ নদের পানি তারা ব্যবহার করতে পারেন না। আমি মেয়র নির্বাচিত হলে এই পানি যেন মুসল্লিরা ব্যবহার করতে পারেন তার ব্যবস্থা করব। দুর্নীতিমুক্ত সিটি করপোরেশন করা হবে আমার প্রথম পদক্ষেপ। ঢাকার মধ্যেই ছিটমহল আছে যেখানে সিটি করপোরেশনের কোনো ক্ষমতা নেই।

মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ : আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, যানজটমুক্ত ও সবার জন্য বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার সংকল্প নিয়ে আমি মেয়র নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। আমি মেয়র হলে বন্যামুক্ত ঢাকা গড়তে সবার আগে এর অসম্পূর্ণ বেড়িবাঁধগুলো সম্পন্ন করব। আমি ‘৬৯ থেকে ‘৭২ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিয়েছি। নগরবাসীর সেবা করার জন্য মেয়র নির্বাচনে এসেছিলাম। এখন দেখছি সিটি করপোরেশনকে লাভের জায়গা মনে করে রাজনীতিবিদরা এখানে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। আমি মেয়র হলে ১০০ বছরের জন্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করব। দীর্ঘমেয়াদে নির্দিষ্ট এলাকা ও বাজেট নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী ইউটিলিটি নিশ্চিতকরণে কাজ করব। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি করে তাদের পরামর্শ মোতাবেক বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করব।

আলহাজ আবদুর রহমান : আমি মেয়র হলে দুর্নীতি দমন নয়, দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে ফেলব। এখন বিভিন্ন প্রার্থী নানা দফায় ইশতেহার ঘোষণা করছেন। যত দফাই বলি, মূল সমস্যা দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি। এ দুটি বন্ধ করতে পারলে নগরে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।

এমনিতেই সমাধান হয়ে যাবে। আমি এমন মেয়র হতে চাই যাতে সবার কল্যাণ করতে পারি। কোন প্রার্থী আমার শত্রু নয়। আমি একটা মার্কেটের চেয়ারম্যান। আমি সবার সেবায় নিয়োজিত থাকব।

মার্কেটের সবাইকে বলেছি সাঈদ খোকনের সভায় গিয়ে বক্তব্য শুনতে। সবাই ব্যানার নিয়ে গিয়েছে। মেয়র প্রার্থীর মন তো এমন হতে হবে।

মাওলানা ফজলে বারী মাসউদ : ঢাকায় অনেক মানুষ বস্তিতে বাস করে। হোল্ডিং নম্বর না থাকায় তারা বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা পায় না। তাদের হোল্ডিং নম্বর দেওয়ার ব্যবস্থা করব। একইসঙ্গে মেয়র হলে নগরবাসীর হোল্ডিং ট্যাঙ্ শতকরা ৩০ ভাগ কমানোর পরিকল্পনা আমার রয়েছে। আমি মেয়র হলে ঢাকার চেহারা বদলাতে ১০০ দিনের টার্গেট নেব। এ সময়ের মধ্যে ঢাকাকে যানজট ও আবর্জনামুক্ত নগরে পরিণত করতে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করব। এ জন্য বিভিন্ন খাতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সে অনুযায়ী কাজ করব। এ ছাড়া নারীদের জন্য নিরাপদ ঢাকা গড়তে যা যা করা দরকার তা করব। আমার ঢাকায় যেন পয়লা বৈশাখে নারী নিগ্রহের মতো ঘটনা আর কখনো না ঘটে। নির্বাচনী মাঠে সেনা মোতায়েন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এতে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। আর ভোটই যদি দিতে না পারে তাহলে পছন্দের মেয়র পাবে কীভাবে?

শহীদুল ইসলাম : ঢাকার মেয়রের হাত-পা বাঁধা। ঢাকা সিটি করপোরেশন ১৭টি মন্ত্রণালয় ও ৫৭টি অধিদফতর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এ অবস্থায় একজন মেয়র চাইলেই নগরের উন্নয়ন করতে পারবেন না। সবার আগে আইন সংশোধন করতে হবে। সিটি করপোরেশনকে স্বশাসিত করতে হবে।’

ঢাকার উন্নয়ন করতে হলে সব মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরকে ডিসিসির আওতায় আনতে হবে। সিটি করপোরেশন নিজে আয় করবে, নিজে ব্যয় করবে। শুধু ডিসিসি নয়, স্থানীয় সরকারের সকল স্তর স্বশাসিত হতে হবে। তাহলেই উন্নয়ন সম্ভব। রাজনীতিকীকরণ বন্ধ করতে হবে। এটা উন্নয়নের পথে বাধা। আজ পরিবহন খাতে যে নৈরাজ্য তা রাজনীতিকীকরণের জন্যই হয়েছে। স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয়, কিন্তু রাজনীতিবহির্ভূত নয়। রাজনীতির জন্যই আমি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে সাঈদ খোকনকে সমর্থন দিয়েছি। ঢাকার প্রথম মেয়র হানিফ সাহেব মেট্রো ঢাকা চেয়েছিলেন। আমি এটার সঙ্গে একমত। তাই তার সন্তানকে সমর্থন দিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছি।

কাজী শহীদুল্লাহ : উত্তরে যারা মেয়র নির্বাচন করছেন তাদের মধ্যে আমি সবচেয়ে গরিব। গরিব মানুষ হিসেবে আমার প্রতি অবিচার করা হচ্ছে। আমার পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। কোথাও পোস্টার লাগাতে পারছি না। সব প্রার্থীর প্রচারে দুটি মাইক ব্যবহার করা হলেও আমাকে করতে দেওয়া হয়নি। মোবাইল কোর্ট এসে মাইক কেড়ে নিয়েছে। আমি এর বিচার চাই। তিনি বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বললেও তা করা হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ, বিএনপির প্রার্থীরা বিভিন্ন অনিয়ম করে প্রচারণা চালালেও তাদের কিছু বলে না। মিডিয়া তাদের কথা বেশি প্রচার করে। আমাদের কথা বেশি বলে না। মেয়র নির্বাচন করতে এসেছি মানুষের সেবা করার জন্য।