গভীর দুঃখ ও বেদনা নিয়েই এই লেখা লিখতে বসেছি। বৃহস্পতিবার রাত থেকেই মনটা ভারী হয়ে আছে। ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক আর নেই, লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন, এই খবরটি গভীর মর্মবেদনার কারণ হয়েছে। তিনি একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে জুলাই মাসে লন্ডন গিয়েছিলেন। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিছুটা সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়াও পেয়েছিলেন। কিন্তু আবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় হাসপাতালে নেয়া হলেও জীবনমৃত্যুর লড়াইয়ে তিনি পরাজিত হন। তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৬৫ বছর। এই অকালে, অসময়ে এভাবে চলে যাওয়া একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তার মতো একজন সদা হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণবান মানুষের এমন বিদায় মনকে ভারাক্রান্তই শুধু করে না, প্রশ্নও জাগে, এমন একজন ভালো মানুষের এমন মৃত্যু পরম করুণাময় স্রষ্টা কেন বরাদ্দ করেছেন? জানি, এ প্রশ্ন অর্থহীন। কারণ ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে?’
এই লেখা যখন লিখতে বসেছি, তখন আনিসুল হককে বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছে ২ ডিসেম্বর বিকেল। তিনি মায়ের কবরের পাশে তার শেষ শয্যা গ্রহণ করেছেন। তার প্রিয় মানুষরা, স্বজনরা, বান্ধবরা তাকে চোখের জলে শেষ বিদায় জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাসায় গিয়ে শোকাতুর পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সহানুভূতি জানিয়েছেন। তিনি আর কাউকে কোনো স্বপ্ন দেখাবেন না, কারো সঙ্গে কোনো প্রতিযোগিতায় নামবেন না, কারো সঙ্গে আনন্দ আয়োজনেও শরিক হবেন না। যে কোনো মৃত্যুই শোকের, বেদনার। তারপরও আনিসুল হকের মৃত্যুবেদনা অসংখ্য মানুষের। বুকের ভেতর এমন এক শূন্যতার সৃষ্টি করবে, যা সহজে পূরণ হবে না। সমস্যা নিয়ে কথা বলার লোক অনেক পাওয়া যায়, কিন্তু সমাধান যাত্রা শুরু করেছিলেন আনিসুল হক।
আনিসুল হক ছিলেন একজন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী মানুষ। সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ। তিনি নিজের চেষ্টায় একটি শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন। কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছেন। তার মতো ব্যবসায়ী বা শিল্প উদ্যোক্তা দেশে আরো আছেন। কিন্তু বিত্ত এবং চিত্তের সমান প্রসারতা তার মতো আর খুব বেশিজনের আছে বলে মনে হয় না। বিত্তবান মানুষরা সাধারণত চিত্তবান হন না। সম্পদ বৃদ্ধির জন্য যে কোনো অন্যায়কেও বৈধ ভাবতে দ্বিধা করেন না। ব্যতিক্রম নেই তা বলা যাবে না। তেমনই এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম আনিসুল হক। তিনি সংস্কৃতিবান, রুচিবান, টেলিভিশনের জনপ্রিয় উপস্থাপক এবং একই সঙ্গে প্রতিভাধর সংগঠক। তিনি ব্যবসায়ীদের একাধিক শীর্ষ সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার নেতৃত্ব গুণের প্রশংসা তার প্রতিপক্ষরাও না করে পারে না। শিল্প-সংস্কৃতির বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ কি শুধু তার মধুর ব্যবহারের জন্যই নাকি তিনি নিজের জন্যও পুষতেন শিল্প-সংস্কৃতির ধারা। আনিসুল হককে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, যারা তার কাছের মানুষ তারা জানেন, তার ভেতরের কোমলতাকেও। অনেক মানুষই তো আছেন, যারা বাইরে বেশ হাসি-খুশি, আমুদে কিন্তু ভেতরে পুষে রাখেন হিংসা-বিদ্বেষ। তারা ভালোবাসেন শুধু নিজেকে। তারা নিজের সম্পদ সমৃদ্ধি বাড়ানো ছাড়া আর কিছু ভাবেন না। তারা কিছু কাজ করলেও করেন বড় কিছু পাওয়ার আশায়।
আনিসুল হক যে তেমন ছিলেন না তা নানাজন স্বীকার করছেন। কেউ কেউ তার কথা, তার মানবিক হৃদয়বৃত্তির কথা লিখছেনও। এই দেশ ও দেশের মানুষ যেমন কিছু দিয়েছে, তিনিও তেমনি কিছু দেয়ার চেষ্টা করেছেন। তাকে নিয়ে আমাদের মাতামাতি যদি ক্ষণস্থায়ী হয়, তার জন্য আমাদের কান্না যদি মায়াকান্না হয়, তাহলে আমাদের দেশে আর কেউ আনিসুল হকের মতো মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে এগিয়ে আসার উৎসাহ পাবেন না। এক আনিসুল হককে হারিয়ে, আরো একাধিক আনিসুল হককে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যদি আমরা তার স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা সৃষ্টি না করে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করি। কিন্তু আমাদের যে জাতীয় বৈশিষ্ট্য তাতে কি মনে হয় আনিসুল হকের শূন্যস্থান পূরণের জন্য আর কোনো প্রত্যয়ী মানুষকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেব? আমরা কারো সাফল্য দেখি না, দোষ-ত্রুটি দেখি। মানুষের এগিয়ে যাওয়ার পথের বাধা দূর না করে, নতুন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করি।
আনিসুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছু লিখতে বসে নিজেকে বড় অপরাধী মনে হচ্ছে। আমাদের অসুস্থ রাজনীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কিছু গণমাধ্যমেও রুচিবিকার দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে কিছু অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিকৃতির পথে হাঁটছে। তিনি যখন লন্ডনে চিকিৎসাধীন, যখন মৃত্যুর সঙ্গে তিনি পাঞ্জা লড়ছেন, তখন আমাদের দেশের কিছু তথাকথিত ‘গণমাধ্যম’ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তাকে নিয়ে কি জঘন্য ও কুৎসিত রাজনীতিই না করেছে। তিনি অসুস্থ হননি, সরকারের সঙ্গে বিরোধের কারণে তাকে জোর করে লন্ডনে নিরাপদে পাঠানো হয়েছে-, এমন সব আজগুবি, গাঁজাখুরি কথাবার্তা লেখা হয়েছে। প্রচার করা হয়েছে। যারা এই অপকর্মগুলো করিয়েছেন, তারা কি এখন অনুতপ্ত? নাকি এখনো তারা কোনো নতুন গল্প ফাঁদবেন আনিসুল হকের মৃত্যু নিয়ে?
আমাদের কারো কারো চিন্তার বিকৃতি ঘটেছে। তাই আমরা ঘটনার চেয়ে রটনায় বেশি উৎসাহী। আমরা খবরের চেয়ে গুজবের দিকে ছুটে বেড়াই বেশি। একজন মানুষের অসুস্থতা নিয়েও নোংরা রাজনীতি করতে যাদের বিবেকে বাধে না, যারা যে কোনো উদার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বধ করার জন্য মুখিয়ে থাকেন, তারা আনিসুল হকের মৃত্যুর পর কি কিছুটা নিজেদের বিবেকের কাছে জবাবদিহি করবেন?
আনিসুল হক প্রচলিত ধারার রাজনীতির মানুষ ছিলেন না। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার কথা কখনো শোনা যায়নি। কিন্তু দেশ, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে যিনি ভাবেন, তিনি কি রাজনীতির বাইরের মানুষ হতে পারেন? রাজনীতি তো রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতির ঘনীভ‚ত রূপ। সে জন্য দলীয় রাজনীতিতে জড়িত না থাকলেও আনিসুল হক ছিলেন একজন পরিপূর্ণ রাজনীতি সচেতন মানুষ। তিনি ছিলেন সাহসী এবং মেধাবী। সমস্যা দেখলে যারা মুখ লুকাবে তিনি সেই দলে ছিলেন না। তিনি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে যেতে পিছপা হতেন না।
ঢাকা মহানগরকে বদলে দেয়া, মানুষের বাসযোগ্য করার প্রতিশ্রুতি নিয়েই তিনি ঢাকা উত্তর সিটি মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার আওয়ামী লীগে যোগদান কিংবা তাকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেয়া নিয়ে আওয়ামী মহলেও খুশির জোয়ার বইয়ে যায়নি বরং অনেকের মনেই ছিল চাপা ক্ষোভ কিংবা অসন্তোষ। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভাপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আনিসুল হককেই ঢাকা উত্তরের মেয়র হিসেবে যোগ্য বলে বিবেচনা করেছিলেন। শেখ হাসিনা মানুষ চিনতে ভুল করেননি। কথায় আছে রতনে রতন চেনে।
আনিসুল হক মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার আগে তার ভোটারদের যেসব স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, মেয়র নির্বাচিত হয়ে সেসব স্বপ্ন পূরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। তিনি যে গতানুগতিক ধারার মানুষ নন, তিনি যে বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছার কৌশল জানেন, তার কিছু প্রমাণ তিনি গত দুই বছরে দিয়েছেন। ঢাকা উত্তর সিটিতে পরিবর্তনের হাওয়া তিনি লাগিয়েছেন। আমরা যারা অস্থির প্রকৃতির, দ্রুত সব কিছু পেতে চাই- তারাও কিন্তু আনিসুল হকের সমালোচনায় বেশি কিছু করতে পারছি না। কারণ এই অল্প সময়ে তিনি এক কথায় অসাধ্য সাধন করেছেন। তিনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছেন, তা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। আমি তার পুনরাবৃত্তি না করে শুধু বলতে চাই, যিনি পরিবর্তন করতে চান, তিনি পরিবর্তন করতে পারেন। কোনো বাধা, কোনো অজুহাত তাকে দমাতে পারে না।
হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা তিনি পেয়েছিলেন। ভালো কাজে সমর্থন ও সহযোগিতা তো প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই মুখ দেখে করেন না। তিনি সবাইকে ভালো কাজে মনোযোগী হওয়ারই পরামর্শই দিয়ে থাকেন। আনিসুল হকের মতো উদ্যোগ ও পরিকল্পনা নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন কয়জন? কথা দিয়ে কথা না রাখার যে সংস্কৃতি আমাদের রাজনীতিতে স্থায়ীরূপ নিতে বসেছে, তাতে বড় ধরনের আশাও করেছেন ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক। তিনি কথা রাখার রাজনীতিতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মানুষের মঙ্গলের কথা ভেবে, মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে, নিজের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না, এমন বিষয়েও তিনি হাত দিয়েছেন। প্রথা ভেঙে তিনি কারো কারো আরো বিরাগভাজন হয়েছেন, কিন্তু ব্যাপক জনগোষ্ঠী তাকে আপন করেই নিয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটির সব সমস্যার সমাধান তিনি করতে পারেননি। তার সব স্বপ্ন তিনি পূরণ করার মতো উপযুক্ত সময় পেলেন না। কিন্তু তার স্বপ্ন ও পরিকল্পনার কথা নিশ্চয়ই তার সহকর্মীরা জানেন। তারা কি এখন ওই ধারা অব্যাহত রাখতে দৃঢ়তার পরিচয় দিতে সক্ষম হবেন? নাকি, আনিসুল হকের বিদায়ের মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের যে সুন্দর সূচনা হয়েছে, তারও বিদায় ঘটবে?
আমরা আশা করব, আনিসুল হক যে পতাকা হাতে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই পতাকাটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন কারো হাতে এবার তুলে দেবেন, যিনি হবেন আনিসুল হকের বিবেকের অনুসারী, আত্মার অনুসারী। দলবাজির চেয়ে মানুষবাজি করা যে অনেক ভালো তা মরে প্রমাণ করে গেছেন আনিসুল হক। আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হকও একজন মেধাবী এবং কর্মঠ উদ্যোগী মানুষ। তারও রয়েছে সৃষ্টিশীল ও মননশীল মনমানসিকতা। তাদের দুই কন্যা ও এক পুত্রও নিজ নিজ থেকে দক্ষ এবং প্রতিষ্ঠিত। আনিসুল হকের হাতে গড়া মোহাম্মদীয় গ্রুপ যেন কোনোভাবেই আনিসুল হকের স্বপ্ন থেকে দূরে চলে না যায়।
জানি, একজন মানুষ কখনো আরেকজন মানুষের পরিপূরক হতে পারে না। কিন্তু একজন মানুষ স্বপ্নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য এক বা একাধিক মানুষ কেন এগিয়ে আসবে না?
আনিসুল হক, আপনাকে বিদায় বলতে কষ্ট হচ্ছে। তবু আমাদের সামনে তো কোনো বিকল্প নেই। আমরা আপনার শূন্যতা নিয়ে হাহাকার না করে শূন্যস্থান পূরণের দিকে যদি একটু মনোযোগ দেই, তাহলেই হয়তো আপনার আত্মা প্রকৃত শান্তি পাবে।
বিভুরঞ্জন সরকার : কলাম লেখক।

