সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি মনোনীত মেয়র ও কাউন্সিলর পদপ্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। অন্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের কথা খুব একটা শোনা যাচ্ছে না। ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের খবর এত বেশি প্রাধান্য দিয়ে প্রচার করা হচ্ছে যে টিভি খুললেই চ্যানেলগুলো প্রতিযোগিতা দিয়ে প্রার্থী ও সমর্থকদের প্রচার-প্রচারণার খবরের পাশাপাশি প্রতিবেদকদের বিভিন্ন ধরনের সংবাদ পরিবেশন দেখতে হচ্ছে।
টিভি চ্যানেলগুলো এই নির্বাচনের খবরকে এতটাই গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছে, যা শুনে মনে হচ্ছে দেশে যেন একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রচারটি মনে হয় অতি প্রচারের পর্যায়ে পড়ে যাচ্ছে! তার পরও টিভি চ্যানেলগুলো ঘণ্টায় ঘণ্টায় প্রচারিত খবরে একই খবর দিয়ে চলছে। দর্শকরা কতটা ঢাকা সিটি করপোরেশনের দৈনন্দিন প্রচার-প্রচারণা নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে, তা বোধগম্য হচ্ছে না। অন্যদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের দুই সিটি করপোরেশনের মনোনীত মেয়র প্রার্থীদ্বয় নির্বাচনকে জাতীয় রাজনীতির চরিত্রদানের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্যে ভোটাররা ১ তারিখ ভোটের বিপ্লব সাধন করতে যাচ্ছে বলে ধারণা দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনে কারচুপি কিংবা জালিয়াতি হলে সরকার পতনের আন্দোলনের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।
ফলে বিএনপির দিক থেকে ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, সরকারের প্রতি জনগণের অনাস্থা ইত্যাদি প্রকাশে ধারণাও দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে নির্বাচন 
ঢাকা সিটি করপোরেশনের সমস্যা বহু পুরনো। প্রায় দুই কোটি মানুষ এই শহরে এখন বসবাস করছে। পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর হিসেবে ঢাকার নাম সবাই জানে। এর সমস্যারও অন্ত নেই। বায়ুদূষণ, পয়ঃপ্রণালী, ওয়াসার পানি সরবরাহ, যানবাহন, জলাবদ্ধতা, রাস্তাঘাট ইত্যাদি সমস্যা ঢাকা শহরে কতটা তীব্র হয়ে আছে, সেটি ভুক্তভোগীরা কমবেশি জানে। এগুলোর সমাধান কতটা জরুরি, সেটিও সবার জানার বিষয়। ঢাকা যখন অভিন্ন সিটি করপোরেশনের অধীনে ছিল তখন এই শহরে জনসংখ্যার চাপ কিছুটা কম ছিল। এর আয়তনও কিছুটা কম ছিল। কিন্তু সমস্যার কোনো অন্ত ছিল না। কারণ ঢাকা শহরকে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দেশের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার মতো পরিকল্পনা আগে সরকার কিংবা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে খুব একটা নেওয়া হয়নি। নির্বাচনে নানা প্রতিশ্রুতির কথা শোনা গেলেও কোনো মেয়রই ঢাকা শহরের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি।
কেননা সিটি করপোরেশনের ওপর বসে আছে সরকারের ৫৪টি নির্বাহী সংস্থা—যাদের সঙ্গে সমন্বয়ের অভাব থেকে কোনো সমাধানই কেউ আশা করতে পারেনি। প্রায় সব মেয়রই নিজেদের অসহায়ত্ব জানিয়ে বিদায় নিয়েছেন। কাজের কাজ ঢাকার কিছু হয়নি। সিটি করপোরেশনের কাজকর্মে দুর্নীতি ছাড়া অন্য কোনো খবর ছিল না, ছিল মানুষের ভোগান্তিও। ফলে অভিন্ন ঢাকা সিটি করপোরেশন নিয়ে সাধারণ জনগণের ভোগান্তি বাড়তে বাড়তে যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছিল, তা থেকে ঢাকায় থাকা মানুষের পক্ষে দুরূহ হয়ে উঠেছিল। সেখান থেকেই ঢাকাকে বিভক্ত করে দুই সিটি করপোরেশনে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এটি মন্দের ভালো। কিন্তু জমে থাকা সমস্যার জট খোলা কোনো সিটি করপোরেশনের পক্ষেই খুব সহজ ব্যাপার ছিল না।
তার পরও বলা যায় ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত দুই সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে বিজয়ী মেয়র পদপ্রার্থীদের মধ্যে আনিসুল হক উত্তর ঢাকা সিটি করপোরেশনকে বদলে দেওয়ার যে মিশন-ভিশন নিয়ে নেমেছিলেন, সেটি ছিল সত্যিকার অর্থেই পরিবর্তনের ঢাকার সূচনা। কিন্তু মেয়র আনিসুল হক বেঁচে না থাকার কারণে সেই ঢাকার চাকা কিছুটা হলেও থমকে গেছে। মেয়র আনিসুল হককে অনুসরণ করে নির্বাচিত মেয়র আতিকুল ইসলাম স্বল্প সময়ের মধ্যে সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণে যথেষ্ট আন্তরিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পরিবর্তনের চাকাকে এতটা সচল করতে না পারলেও সেখানেও পরিবর্তনের প্রভাব কমবেশি পড়েছিল। দুই ঢাকা সিটি করপোরেশনই গত মেয়াদে নানা সীমাবদ্ধতার পরও পরিবর্তনের ধারায় চলছে বলে নগর বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এই ক্ষেত্রে ভিশনারি ও মিশনারি নেতৃত্ব ছাড়া এবং সরকারের ওপর মহলের বিশেষ সহযোগিতা ছাড়া ঢাকা শহরের জনজীবন সত্যিই সিটি করপোরেশনের পক্ষে পরিবর্তনের কোনো ধারায়ই সচল করা সম্ভব নয়। মেয়র আনিসুল হক যে নজির স্থাপন করে গেছেন, সেটি বৃহত্তর ঢাকার ভোটারদের কাছে বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে। তারাও বিশ্বাস করে, ভিশনারি ও মিশনারি নেতৃত্ব ছাড়া, পরিবর্তনশীল সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা ছাড়া দুই সিটি করপোরেশনেরই ভবিষ্যৎ স্বপ্ন গুড়েবালির বেশি কিছু হওয়ার কোনো কারণ নেই। যেখানেই মেয়র হাত দেবেন সেখানেই হাজারো সমস্যা। সেসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন দৃঢ়তা এবং কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। সেই ধরনের নেতৃত্ব ছাড়া ঢাকা শহর পরিবর্তনের সূচিত ধারায় খুব একটা পরিবর্তিত হওয়ার নয়।
ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে হলে এর উত্তর এবং দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম—যেখানে যে ধরনের পশ্চাৎপদতা রয়েছে, সিটি করপোরেশনের কাঠামোতে সেগুলোর উত্তরণ বাদে অধিবাসীদের কোনো প্রত্যাশাই বাস্তবে রূপ দেখবে না। সে জন্য প্রয়োজন হচ্ছে একটি বলিষ্ঠ, দৃঢ়, জনসমর্থিত ও সরকার কর্তৃক সব ধরনের সহযোগিতাপুষ্ট নগর জনপ্রতিনিধি—যাঁরা আগামী পাঁচ বছর ঢাকাকে বদলে দেওয়ার মতো দৃঢ়তায় রাত-দিন কাজ করবেন। যেমনটি শুরু করেছিলেন প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। আনিসুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তখনই বাস্তবে রূপ পাবে যখন নতুন জনপ্রতিনিধিরা ঢাকাকে পরিবর্তনের সেই সূচিত ধারায় পরিচালিত করবেন। তবে আনিসুল হক এককভাবে সব কিছু করেননি, তাঁর পেছনে ছিল সরকারপ্রধানের অকুণ্ঠ সমর্থন। বাংলাদেশে সেই সমর্থন ছাড়া ঢাকা শহরের মতো একটি সমস্যাসংকুল রাজধানীকে একুশ শতকে বিশ দশকের জন্য উপযোগী করে গড়ে তোলা কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে পরিবর্তনের হাওয়া সচল হতে দেখা মোটেও সহজ কাজ নয়, তবে অসম্ভব কিছুও নয়। ১ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন থেকে লাভ করা জনপ্রতিনিধি ভিশনারি ও মিশনারি নেতৃত্ব আমাদের ঢাকা শহরে থাকার পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন—সেটি সবার কাম্য।
লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

