হাসান আহমদ। পেশায় সাবরেজিস্ট্রার অফিসের একজন মুহরি (ডিড রাইটার)। গত ১৪ মে একটি জাতীয় দৈনিকে তাঁর নামে ছাপা ছোট একটি বিজ্ঞাপন পাঠক সচেতন মানুষের মধ্যে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। গাঁটের টাকা খরচ করে এই বিজ্ঞাপন ছাপানোর উদ্দেশ্য কী? অনেকেই খোঁজখবর নিতে থাকেন এর নেপথ্যের কারণ।
বিষয়টি কালের কণ্ঠ’র নজরেও আসে। বিস্তারিত জানার জন্য এই প্রতিবেদক হাসান আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমাকে নিয়ে আপনাদের পত্রিকায় কিছু লেখা মানে আমাকে তোষামোদি করা। আমি তোষামোদি ঘৃণা করি। তাই আপনার কাছে কিছু বলতে চাই না। ‘ এই প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে যখন বলা হলো আপনার কথা আমরা সারা দেশকে বিস্তারিত জানাতে চাই। আপনার কথা পড়ে আরো অনেকে সচেতন হবে, তোষামোদকারীরাও হুঁশিয়ার হবে। তখন তিনি বলতে শুরু করলেন; ‘আমি কোনো রাজনৈতিক সদস্য নই। খুবই সাধারণ মানুষ। আমার কোনো কথা কোনো সাংবাদিক সংবাদপত্রে প্রকাশ করতে পারে তা ধারণাতে ছিল না। তাই গাঁটের পয়সা খরচ করেই বিজ্ঞাপন দিয়ে আমার কথাটুকু আমি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসহ সারা দেশবাসীকে জানিয়েছি। ‘
কেন আপনি এই কথাটুকু বললেন; এমন প্রশ্ন করলে হাসান আহমদ বলেন, “১১ মে ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ‘কাজের পাহাড়, সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিসে আনিসুল’ শিরোনামে সংবাদ দেখি। ওই সংবাদে বলা হয় গত ১০ মে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আনিসুল হক সাড়ে ৩টার সময় নগর ভবনে যান। এ সময় তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য আগে থেকেই নগর ভবনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ফুলের তোড়া নিয়ে ভবনের প্রধান ফটকে অপেক্ষা করছেন। বিষয়টি ভালোভাবে নেননি আনিসুল হক। তিনি ওই কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘নেক্সট টাইম ডোন্ট ডু দিস। ডোন্ট কাম ডাউন। ‘ আনিসুল হকের এমন কথা আমার মনে দাগ কেটেছে। তাই আমি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বলেছি ‘ঢাকা উত্তরের নবনির্বাচিত মেয়র আনিসুল হক ১০ মে ২০১৫ তারিখে নগর ভবনে উপস্থিতির সময় নগর ভবনের কর্মচারী-কর্মকর্তাগণসহ প্রধান নির্বাহী ভবনের প্রধান ফটকে তোষামোদমূলক অভ্যর্থনায় এগিয়ে আসলে আনিসুল হক তাঁদেরকে নিরুৎসাহী করায় তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। ”
হাসান আহমদ বলেন, ‘আমি মনে করি আমাদের এ প্রিয় দেশ আজ তোষামোদকারী-চাটুকারে সয়লাব হয়ে গেছে। কিন্তু তোষামোদি গ্রহণ না করা ব্যতিক্রমী বিষয়। ভবনের নিচে প্রধান ফটকে আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোভাব তিনি বুঝতে পেরেছেন। এ জন্যই আনিসুল হক তাঁদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন। আমার কাছে তাঁর এ সতর্কতা একটি মহৎগুণ হিসেবে মনে হয়েছে। তিনি ব্যতিক্রম। তোষামোদকারী-চাটুকারদের কারণে আজ দেশে রাজনীতিবিদ জনপ্রতিনিধিদের পাশে যেতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। সৃষ্টি হয়েছে দূরত্ব। অভ্যর্থনাকে নিরুৎসাহিত করা, তাঁদের অবজ্ঞা করা আমার উদ্দেশ্য নয়। বরং এতে সব চাটুকারের জন্য একটি বার্তা রয়েছে যে তাদের দায়িত্ব জনগণের সেবা। তোষামোদ করে নিজ দায়িত্বে অবহেলা করে জনগণকে সেবা থেকে বঞ্চিত না করা।
এ দেশের সম্ভাবনা অনেক। কিন্তু কেন বারবার হোঁচট খাচ্ছি আমরা?’ এমন প্রশ্ন করে তিনি বলেন, ‘মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনভর ভুক্তভোগী মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। তিনি সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার জনগণ আপনাদের ভাই, চাচা, মামা, বাবা। তাদেরকে সম্মান করতে হবে। কিন্তু এ বক্তব্য তাঁর জন্য সুখকর হয়নি। তাঁকেই আবার বলতে শুনেছি; আমার চারদিকে চাটার দল। ‘
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা মরহুম মাওলানা ডা. আব্দুর রশিদের নাতি ও আসাম প্রভিন্সের প্রথম মুসলিম মহিলা পণ্ডিত কমরুন্নেছা খাতুনের বংশধর হাসান আহমদ ডিড রাইটিংয়ের কাজ করছেন ১৯৮১ সাল থেকে। চার ছেলে ও তিন মেয়ের জনক হাসান আহমদ মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার পুরাতন রাজবাড়িতে থাকেন।

