দুপুরের উজ্জ্ব্বল রোদে আকাশ থেকে তিনি যখন নেমে এলেন নিজের সাজানো শহরে—তাঁর চোখ নিমীলিত; ঘুমিয়ে আছেন মাতৃভূমির পতাকা বুকে নিয়ে। এরপর শ্বেতশুভ্র ফুলে ঢাকা গাড়িতে করে বেরিয়ে এলেন বিমানবন্দর ছেড়ে। অল্পদিনেই ঢাকাসহ দেশবাসীর ভালোবাসার মানুষ হয়ে ওঠা ঢাকা উত্তরের মেয়র সাড়ে তিন মাস আগে যখন ঢাকা ছাড়েন লন্ডনের উদ্দেশে তখনো তিনি প্রাণবন্ত, উচ্ছল মানুষ। গত শনিবার দুপুর সোয়া ১টায় সেই ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁর মরদেহ নিয়ে হাজির হন স্ত্রী রুবানা হক, ছেলে নাভিদুল হকসহ স্বজনরা।
ঢাকা উত্তরের মেয়র মাত্র চার ঘণ্টা ‘ঘুমন্ত’ ঘুরলেন চিরচেনা পথঘাট, নিজ বাড়ি; কাটালেন অশ্রুসজল আপনজনদের মাঝে। শেষ বিকেলে লাল-সবুজের গালিচায় লাখো মানুষের ভালোবাসা ও হৃদয়বিদারী অভ্যর্থনা নিয়ে চিরঘুমে শুয়ে পড়লেন মাটির ঘরে—মায়ের কোল ঘেঁষে, ছোট সন্তানের পাশে। ‘আনিসুল হক’ মাত্র কিছুদিন আগে বনানী কবরস্থানকে সাজিয়ে তুলেছিলেন বাগানের মতো করে। সেই বাগানে তাঁকে শুইয়ে দিতে না দিতেই যেন সেই বেদনায় দ্রুত নেমে আসে সন্ধ্যা।
ছোট ভাই সেনাবাহিনীর প্রধান আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক—সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরসহ অন্যরা বিমান থেকে নামিয়ে আনেন মরদেহ। এ সময় বিমানবন্দরের আশপাশে ও সড়কে ভিড় করে শত শত মানুষ। অপেক্ষমাণ ফুল দিয়ে সাজানো লাশবাহী গাড়িতে করে বিমানবন্দর থেকে আনিসুল হককে নিয়ে আসা হয় বনানীর নিজ বাড়িতে। আগে থেকেই সেখানে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা। ছিলেন সরকারি পর্যায়ের কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশনের জনপ্রতিনিধিরাও। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর কিছু সময় পর দুপুর ২টা ৫০ মিনিটের দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছুটে আসেন সেখানে। সমবেদনা জানান আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হকসহ সন্তান ও পরিবারের অন্যদের। প্রধানমন্ত্রী প্রায় আধাঘণ্টা ওই বাড়িতে অবস্থান করেন। দুপুরেই আনিসুল হকের বাবা শরীফুল হককে তাঁর আরেক ছেলে সেনাপ্রধান শফিউল হকের বাসা থেকে একটি অ্যাম্বুল্যান্সযোগে নিয়ে আসা হয় ছেলে আনিসুল হকের বাসায়। শোকার্ত জনক সন্তানের মরদেহের পাশে মিনিট বিশেক অবস্থান করেন নীরবে। বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে মরদেহ বের করা হয় আর্মি স্টেডিয়ামে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। ৩টা ১৭ মিনিটে স্টেডিয়ামের ভেতরে লাশবাহী গাড়ি প্রবেশের আগেই সেখানে ভিড় জমেছিল লাখো মানুষের। দল-মত-নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ গিয়েছিল প্রিয় মানুষটির প্রতি ভালোবাসা ও শেষবিদায় জানাতে। এরপর বিশেষ অস্থায়ী মঞ্চে রাখা হয় মরদেহ। অনেক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের পক্ষ থেকে অর্পণ করা হয় পুষ্পার্ঘ্য। এ সময় আনিসুল হকের কফিন ঢাকা ছিল জাতীয় পতাকায়। ভিড় ঠেলে সবাই উদ্গ্রীব ছিল একনজরে আনিসুল হকের চিরঘুমের চেহারাটুকু দেখার জন্য। সেখানেই অনুষ্ঠিত হয় আসরের জামাত। পরে অনুষ্ঠিত হয় জানাজা। এ সময় কফিন ঢাকা ছিল জাতীয় পতাকা ও ঢাকা উত্তর সিটির পতাকায়।
এর আগে প্রথাগতভাবেই সমবেত মানুষের উদ্দেশে বক্তব্য দেন প্রয়াতর বড় ছেলে নাভিদুল হক। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা খুবই সুখী মানুষ ছিলেন। তিনি কখনো তাঁর বা পরিবারের স্বার্থে কাউকে কষ্ট দেননি। কারো খারাপ চাইতেন না। তার পরও যদি কাজের ক্ষেত্রে বাবা কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকেন, তবে দয়া করে ক্ষমা করে দেবেন। ’
জানাজার পর আরো কিছু সময় মরদেহ ওই মঞ্চে রেখে সাধারণ মানুষকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে মরদেহ নেওয়া হয় বনানী কবরস্থানে। সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে মরদেহ নামানো হয় কবরে। তাঁর কবরের পাশেই তাঁর মা ও ছোট সন্তানের কবর। পরে দোয়া করা হয়। দাফনের সময়ও বিপুলসংখ্যক মানুষ কবরস্থানে ভিড় করে। এ সময় পরিবারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, আগামী ৬ ডিসেম্বর গুলশান আজাদ মসজিদে আনিসুল হকের কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে। এতে সবাইকে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়।
এর আগে আনিসুল হকের মরদেহ ঢাকায় আসার খবর পেয়ে তাঁর বনানীর বাসভবনে আসা ও আর্মি স্টেডিয়ামে জানাজায় অংশ নেওয়া অন্যদের মধ্যে ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, ফারুক খান, মহিউদ্দীন খান আলমগীর, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ ও জাহাঙ্গীর কবির নানক, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবীর খোকন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, লেখক ও শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল, শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস, নাট্যজন অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ, এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, প্রথম সহসভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম, বিজিএমইএর সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান, সহসভাপতি মোহাম্মদ নাছির, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী, মো. আতিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা। এ সময় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা আনিসুল হককে নিয়ে গণমাধ্যমের কাছে প্রতিক্রিয়া জানান।
আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আনিসুল হক একজনই হয়। হয়তো তাঁর বিকল্প আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমরা আনিসুল হকের সবুজ ঢাকা ও পরিচ্ছন্ন ঢাকার স্বপ্ন বৃথা যেতে দেব না। ’
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আনিসুল হক তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের স্মৃতিতে সব সময় অম্লান থাকবেন। তিনি অনেক সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে দেখিয়ে গেছেন—সততা ও স্বচ্ছতা থাকলে অনেক কঠিন কাজও সহজে করে ফেলা যায়। ’ বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আনিসুল হক সত্যিই অন্যরকম করে নগরীকে সাজানোর চেষ্টা করেছেন। কাজের মাধ্যমেই তিনি মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। ’ ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘আনিসুল হকের শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। আমরা একসঙ্গে অনেক কাজ করেছিলাম। তিনি প্রেরণা হয়ে থাকবেন। ’
শোকার্ত কার্যালয় : গতকাল রবিবার রাজধানীর গুলশাল-২ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় শোকের ছায়া। বিশাল কালো ব্যানারে শেষ শ্রদ্ধার কথা বলা। প্রবেশ ফটকে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তা কর্মকর্তা আওলাদ হোসেন বলেন, ‘এক বছর ধরে এখানে আছি, কিন্তু উনার মতো এমন মানুষ কোথাও পাইনি। তিনি অফিসে যাওয়া-আসার সময় প্রায়ই আমাদের খোঁজখবর নিতেন, এমনকি পরিবারের খোঁজও নিতেন। স্যার এখন নেই বুকটা হু হু করে কেঁদে ওঠে। ’ নগর ভবনে প্রবেশ করতেই নিচতলায় এক পাশে মেয়র আনিসুল হকের বিশাল ছবি। ছবির পাশেই বসে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন এবং প্রতিক্রিয়া লেখায় মশগুল জাইকার প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. আনিসুজ্জামান। আনিসুল হক সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাঁর কোনো অহংবোধ ছিল না। মাটির মানুষ ছিলেন। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতেন। কোনো শুক্রবার কিংবা ছুটির দিন ছিল না। দেশে কিংবা বিদেশে নয়—যখনই ফোন দিয়েছি তখনই পেয়েছি। এমন একজন মানুষ হারিয়ে যাবেন এটা কল্পনাও করতে পারিনি। ’ উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টর থেকে এসেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা সাইফুল আলম শিমুল। শোক বইয়ে স্বাক্ষর শেষে বলেন, ‘আমার আত্মীয় নয়, উনার সঙ্গে আমার রক্তের সম্পর্কও নেই, তারপর কেন এত খারাপ লাগছে বুঝতেছি না। ভেবেছিলাম, আমাদের দুর্ভোগের নগরীতে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার নায়ক বুঝি পেলাম, কাজও সে মতে শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু নগরবাসীকে এতিম করে এভাবে চলে যাবেন ভাবতে পারিনি। ’
মিরপুর থেকে এসেছেন আয়শা ট্রেড সিস্টেমের মালিক ও ডিএনসিসির ঠিকাদার কে এম মনোয়ারুল ইসলাম বিপুল। তিনি শোক বইয়ে স্বাক্ষর এবং প্রতিক্রিয়া লেখা শেষে বলেন, ‘নির্বাচনের সময় থেকেই উনাকে চিনি এবং জানি। একজন বিশাল মনের অধিকারী। ’ সেখান থেকে একটু সামনে যেতেই দেখা যায়, ফ্রন্ট ডেস্কে মাথা নিচু করে বসে আছেন আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ‘শরীরটা ভালো কিন্তু মনটা অসুস্থ। স্যারের মতো মানুষ এভাবে হারিয়ে যাবেন বিশ্বাস করতে পারছি না আমি। ’ কথাগুলো বলতে গিয়ে দুচোখ বেয়ে পানি পড়তে থাকে আজাদের। চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘স্যারের সঙ্গে আমাদের ছিল পিতা-পুত্রের সম্পর্ক। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অসুস্থ শুনলে খোঁজ নিতেন এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। ডিএনসিসির গাড়িচালক ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘স্যার সরকারি গাড়ি এবং ড্রাইভার কিংবা গাড়ির তেল কোনো সময় ব্যবহার করতেন না। নগর নিয়ে যেমন চিন্তা করতেন, তেমনি আমাদের নিয়ে ভাবতেন। প্রতিটি মানুষের সঙ্গেই ছিল স্যারের খুবই ভালো সম্পর্ক। ’
মেয়রের মৃত্যুতে ঘোষিত শোক কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল ডিএনসিসির সব বিভাগই বন্ধ ছিল। নগর ভবনের নবম-অষ্টম তলায় মেয়র আনিসুল হকের কার্যালয়। সেটি বন্ধ দেখা যায়। পাশেই তাঁর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মিজানুর রহমান মন মরা হয়ে বসে আছেন নিজের টেবিলে। পাশেই বসে আছেন মেয়রের স্বজন আমেরিকাপ্রবাসী এজাজ চৌধুরী। এ প্রতিবেদকের পরিচয় দিয়ে আনিসুল সম্পর্কে জানতে চাইলে মিজানুর রহমান বলেন, ‘আজ অফিস বন্ধ, কিন্তু বাড়িতে থাকতে পারিনি আমি। জাতিসংঘের কাজ করতাম। সেখান থেকে এনে স্যার আমাকে উনার এপিএস হিসেবে নিয়োগ দিলেন। উনার প্রতিটি কাজেই আমি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলাম। আজ স্যার নেই যেন আমার পিতা নেই। তিনি স্বপ্নবাজ মানুষ ছিলেন। স্বপ্ন দেখাতেন এবং সেটা বাস্তবায়নের পথ দেখিয়ে দিতেন। কিন্তু তিনি নেই এটা কিভাবে মেনে নিব। ’ মেয়রের চাচাতো ভাই প্রবাসী এজাজ চৌধুরী বলেন, ‘আনিস ভাইকে কারো সঙ্গেই তুলনা করা যাবে না, তিনি একজনই। ’
মেয়র আনিসুল হক নাতির জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে প্রায় সাড়ে তিন মাস আগে লন্ডনে যান। সেখানে তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে চিকিৎসকরা তাঁকে স্যারিব্রাল ভাস্কুলাইটিসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত করেন। পরে তাঁকে একাধিকবার আইসিইউতে রাখা হয়। সর্বশেষ আইসিইউতে থাকা অবস্থায়ই গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১০টায় তাঁর মৃত্যু ঘটে।
আনিসুল হক ২০১৫ সালে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে ছিলেন ব্যবসায়ী নেতা। আরো আগে তিনি খ্যাতি কুড়িয়েছিলেন টেলিভিশনের উপস্থাপক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে।

