নীলফামারীর সৈয়দপুরে এক পারিবারিক আড্ডায় বসে আছি। হঠাৎ টেলিভিশনের পর্দার স্ক্রলে ঢাকা উত্তর সিটির মেয়রের মৃত্যু সংবাদ পড়ে আমার ছোট বোন প্রথমে চিৎকার দিলো, তারপর হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো। আসল ঘটনা তখনও আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়নি। ছোট বোন কেন এভাবে হাউমাউ করে কাঁদছে বুঝতে পারছি না। তাকে যতই বলি–অ্যাই কী হয়েছে? এভাবে কাঁদছিস কেন? সে ততই জোরে হেঁচকি তুলে কাঁদে। মহা-যন্ত্রণা তো। তাকে ধমক দিলাম–অ্যাই কান্না থামা। কী হয়েছে বল। ধমক খেয়ে সে কিছুক্ষণের জন্য কান্না থামালো। টেলিভিশনের পর্দায় চোখে ফেলে বলল–ওই যে দ্যাখেন! ততক্ষণে আমার স্ত্রীও কাঁদতে শুরু করেছে। ‘ইন্নালিল্লাহে ওয়াইন্নাইলাইহে রাজেউন…’– বলেই সে কাঁদতে কাঁদতেই মন্তব্য করলো–আহারে বড় ভালো লোক ছিল! পাশের ঘরে আসরের নামাজ পড়ছিলেন আমার মা। তিনি নামাজ শেষ করে ছুটে এসে বললেন–অ্যাই কী হয়েছে? তোমরা এভাবে কাঁদতেছ কেন? কেউ কি মারা গেছে? আমার স্ত্রী তাকে ঘটনাটা বুঝিয়ে বলতেই তিনি যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন! তার চোখেও পানি। কাঁদতে কাঁদতেই প্রশ্ন করলেন–ঢাকার মেয়র…ওই যে বিটিভিতে অনুষ্ঠান করতো…শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে একসঙ্গে বসিয়ে টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করেছিল, সেই লোকটা না? মারা গেছে? আহারে বড় ভালো লোক ছিল। মা কাঁদতেই কাঁদতেই আবার জায়নামাজে গিয়ে বসলেন!
আমার চোখেও পানি। কোনোভাবেই কান্না থামাতে পারছি না। আমার বেলায় এটা ঘটাই স্বাভাবিক। কাছ থেকে দেখা প্রিয় মানুষের মৃত্যুতে চোখে পানি আসবেই। আমার স্ত্রী কাঁদছে, সে ক্ষেত্রেও একটা কারণ আছে। সে একজন অভিনেত্রী। অসংখ্যবার মেয়র আনিসুল হকের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে। কাছ থেকে দেখা জনপ্রিয় একজন মানুষের মৃত্যুতে চোখে কান্না আসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার বোন ও মা এরা দু’জন কাঁদছে কেন? ওদের সঙ্গে তো মেয়র আনিসুল হকের কোনোদিন পরিচয়ই হয়নি। আমরাও তাদের কাছে ঢাকার মেয়রকে নিয়ে কোনোদিন কথা বলিনি। তাছাড়া এমন তো না আনিসুল হক সৈয়দপুরের মেয়র। তিনি তো ঢাকার একটি অংশের মেয়র ছিলেন। ঢাকার মেয়রের জন্য সৈয়দপুরের সাধারণ মানুষের এত কান্না কেন? একবার ভেবেছিলাম একথা তাদের কাছে জানতে চাইবো। কিন্তু জিজ্ঞেস করা হয়নি। তবে আবেগের এই বিষয়টিতো স্পষ্ট। আনিসুল হক শুধু ঢাকার যোগ্য মেয়র ছিলেন না। সৎ, নিষ্ঠাবান ও সত্যবাদী চেতনার আদর্শবান মানুষ ছিলেন তিনি। কাজেই তাকেই তো মানুষ ভালোবাসবেই। সৈয়দপুর গিয়েছিলাম পারিবারিক কাজে। রাতে নীলসাগর ট্রেনে ঢাকায় ফিরব বলে সৈয়দপুর রেল স্টেশনে হাজির হয়েছি। রাত ১০টা বাজে। যাত্রীতে ঠাসা গোটা স্টেশন! ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি। পাশেই একদল তরুণ নিজেরা আলাপ করছে। ঢাকার মেয়রের ব্যাপারেই কথা বলছে তারা। একজন বললো, এই ধরনের সাহসী ও দেশপ্রেমিক মানুষ আর কি পাবো আমরা? তার পাশের জন বলল, মানুষটার সাহস ছিল বটে। অন্যায় সহ্য করতে পারতো না। তেজগাঁওয়ের ট্রাক স্ট্যান্ড কিভাবে উচ্ছেদ করছে, ভাব একবার? জীবনের হুমকি ছিল। পরোয়া করেনি। এখন রাস্তাটা দেখলে কী যে সুখ লাগে! তার কথা টেনে নিয়ে অন্য একজন বললো, ‘ঢাকার গুলশান আর বনানীর চেহারা তো মামা বদলায়া দিছে। সব কিছু এখন ঝকঝকা, ফকফকা…’
ট্রেন এসে পড়েছে। এসি বাথে মুখোমুখি সিটের যাত্রী আমার চেয়ে বয়স্ক। ভদ্রলোক ব্যবসায়ী। ব্যবসার কাজে ঢাকা যাচ্ছেন। একথা-সে কথা। সাংবাদিকতা পেশায় আছি শুনে আগ্রহভরে ঢাকার প্রয়াত মেয়রের কথা তুললেন। ভাই আনিসুল হকের সঙ্গে নিশ্চয়ই আপনার পরিচয় ছিল? জন্ম-মৃত্যু তো ভাই সৃষ্টিকর্তার হাতে। কিন্তু আল্লাহ যদি আনিসুল হককে আর কয়েকটা বছর বাঁচাইয়া রাখতেন, তাইলে ঢাকা আরও বদলাইয়া যাইতো। সাহস ছিল মানুষটার। তাকে সামনা-সামনি দেখার সুযোগ হয় নাই। তবে টিভিতে তাকে প্রায়ই দেখতাম। মুখের হাসিটা ছিল চমৎকার। রাতের প্রায় সারা পথ ভদ্রলোক মেয়র আনিসুল হকের কথাই বলে গেলেন!
পরেরদিন সকালে ঢাকা বিমানবন্দর রেল স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে গুলশান নিকেতনে আমার বাসার উদ্দেশে একটি সিএনজি অটো রিকসায় উঠে পড়লাম। মাঝবয়সী ড্রাইভার নিশ্চুপ অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আর্মি স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেয়ালে মেয়র আনিসুল হকের ছবি দেখে হঠাৎ তিনি কেঁদে ফেললেন। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, অ্যাই, আপনি কাঁদতেছেন কেন? চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বললেন, ‘মানুষটা বড় ভালো ছিলেন।’ আপনি কার কথা বলতেছেন? প্রশ্ন করতেই আনিসুল হকের ছবির দিকে আঙুল তুলে তিনি বললেন, ‘ওই যে দ্যাখেন। এই রকম ভালো মেয়র আমরা কি আর কোনোদিন পাবো?’ বলেই চোখের পানি মুছতে থাকলেন।
বিকেলে ঢাকায় আর্মি স্টেডিয়ামে মেয়র আনিসুল হকের লাশ এলো। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা, দেশের প্রায় সব সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের ভিড়ে গোটা স্টেডিয়ামে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। পারিবারিকভাবেও এসেছেন বহু মানুষ। সবার হাতে ফুল। ভিড় ঠেলে সামনে এগুনোর সুযোগ পাচ্ছে না অনেকে। তবু ফুল হাতে নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে। কাঁদছে অনেকে। একজন বয়স্ক মহিলা একটি গোলাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্টেডিয়ামের এক পাশে। জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় থাকেন? বিমর্ষ চেহারায় জবাব দিলেন, ‘পাশেই গুলশানে থাকি! মেয়র কি আপনার পরিচিত ছিলেন? প্রশ্ন করতেই বললেন, না, কোনোদিন তার সঙ্গে আমার সরাসরি দেখা হয় নাই। টিভিতে প্রায়ই তাকে দেখতাম। তাকে আমার পরিবারেরই একজন সদস্য মনে হতো। বিশেষ করে তার কথাবার্তা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে সাহসী ভূমিকা আমাকে মুগ্ধ করতো। তেজগাঁও এলাকার ট্রাক স্ট্যান্ডটি সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি যে ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা সত্যি প্রশংসনীয়। ভাবা যায়, এতবড় একটি রাস্তা বছরের পর বছর অবৈধভাবে দখল করে রাখা হয়েছিল। শুধু কি তেজগাঁও বাসস্ট্যান্ড? মহাখালী, কাওরান বাজার, মোহাম্মদপুর, মীরপুর-১২, কল্যাণপুর, গাবতলী, আমিনবাজার, আব্দুল্লাহপুরসহ ঢাকা শহরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবৈধভাবে দখল করে রাখা সরকারি জমি উদ্ধার করেছেন তিনি। বড় ভালো ছিলেন! ’বলেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন সেই মহিলা।
বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের কর্মময় জীবনের প্রশংসা করে চলেছেন দেশের বিশিষ্ট জনেরা। আনিসুল হক কেন এত জনপ্রিয় ছিলেন, তার ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন অনেকে। জল ও জমি দখল, বায়ু ও শব্দ দূষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। আধুনিক বাসযোগ্য ঢাকা নগরী গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ছিল তার। নগরীর অসংখ্য খাল যারা দখল করেছেন, খাল ভরাট করে যারা বাড়ি তুলেছেন, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়েছেন তারা নিশ্চয়ই আনিসুল হকের অকাল মৃত্যুতে খুশি হয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবে নগরীতে অবৈধভাবে দখল করে রাখা জল ও জমি উদ্ধার করতে গিয়ে জীবদ্দশায় আনিসুল হক অনেক হুমকির সম্মুখীন হয়েছিলেন। অবৈধভাবে দখল করে রাখা তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড উদ্ধার করতে গিয়ে প্রকাশ্য বিরোধিতার মুখেও পড়েছিলেন তিনি। এমন অদৃশ্য ও দৃশ্যমান অনেক শক্তির মোকাবিলা করতে হয়েছিল তাকে। মেয়র নেই। তার গতিময় কর্মধারা বিশেষ করে আধুনিক নগর গড়ার অসমাপ্ত কাজগুলোর কী হবে? প্রসঙ্গক্রমে দেশের একটি পত্রিকায় প্রকাশিত বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, নির্মাতা, টিভি উপস্থাপক হানিফ সংকেতের একটি বক্তব্য তুলে ধরতে চাই। তিনি বলেছেন, ‘‘দেশের উন্নয়ন, দেশের অগ্রগতির জন্য নেতা হতে হয় না। প্রয়োজন একটা ভালো আত্মার, প্রয়োজন একজন ভালো মনের মানুষের। আনিসুল হকের মধ্যে সবই ছিল। দেশের জন্য সেই উদাহরণই রেখে গেলেন তিনি। ঢাকা উত্তরের মেয়র নির্বাচিত হয়ে স্বল্প সময়ে মিরপুর, তেজগাঁওয়ের বাস, ট্রাকস্ট্যান্ডসহ অবৈধভাবে দখল করা একাধিক জায়গা দখলমুক্ত করে মানুষের চলাচলের উপযোগী করে দিয়েছেন। মিরপুরে বেশ কয়েকটি রাস্তায় সিটি করপোরেশনের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে সতর্ক করা আছে: ‘বাস দাঁড়ালেই দণ্ড’। এসব সতর্ক আনিসুল হক রাত-দিন নিজেই তদারকি করতেন। ফলে ওই সব এলাকায় যানজট কমে গিয়েছিল। দুঃখের বিষয়, আনিসুল হক অসুস্থ হয়ে যুক্তরাজ্যের হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে ওইসব রাস্তায় নিয়ম আর মানছেন না বাসচালকেরা। মাস দু-এক আগে দেখলাম ‘দাঁড়ালেই দণ্ড’ লেখা সাইনবোর্ডের নিচেই বাস দাঁড়িয়ে আছে।’’
তাহলে অবস্থা কী দাঁড়ালো? মেয়র অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায়ই অনেকে নগর পরিচালনায় নির্ধারিত আইন মানেননি। আর এখন তো মেয়র বেঁচে নেই। দুষ্ট লোকেরা কি আদৌ নিয়ম মানবেন?
লেখক: সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার

