রাজধানীর নীলক্ষেতের ফুটপাতে বইয়ের দোকান আর ফার্মগেটে ফুটপাত জুড়ে হকারদের হাকডাক এখন অনেকটাই নেই। নেই চিরচেনা ভিড়, স্বচ্ছন্দে পায়ে হেটে পথ চলছেন পথচারীরা। রাস্তার যান চলাচল স্বাভাবিক। তবে নগরবাসীদের অনেকে ফুটপাতের দোকান থেকে সহজে ও কমমূল্যের পণ্য কিনতে না পারার সুযোগ হারানোর কথাও জানিয়েছেন। উচ্ছেদ হওয়া হকারদের জন্য হলিডে মার্কেটের কথা থাকলেও তার বাস্তবায়নে বিলম্বে আক্ষেপ জানিয়েছেন হকাররা।
দীর্ঘদিন ধরে দখলে থাকা রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা নীলক্ষেত-নিউমার্কেট এবং ফার্মগেটে ফুটপাতগুলো দখল মুক্ত করার পর সরেজমিন ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
এ চিত্রকে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দুই বছরের অন্যতম ইতিবাচক অর্জন হিসেবে দেখছেন নগরবাসী। তাদের আশা এ চিত্র বজায় থাকলে সহনীয় হয়ে আসবে নগরীর পরিবেশ। ধীরে ধীরে হয়ে উঠবে বাসযোগ্য।
২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন ঢাকা দক্ষিণে মোহাম্মদ সাঈদ খোকন এবং ঢাকা উত্তরে আনিসুল হক। মেয়র হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ৬ মে আনিসুল হক এবং ৭ মে মোহাম্মদ সাঈদ খোকন নিজ নিজ করপোরেশনের দায়িত্ব নেন। বদলে যাওয়া পরিস্থিতে সন্তোষ জানিয়ে তেজতুরী বাজারে বসবাসকারী রোকেয় খানম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘নগরীর পরিবেশ আগের চেয়ে পরিবেশ কিছুটা ভালো মনে হচ্ছে আমার কাছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আরও ভালো কিছু পাবো বলে আশা করি।’
গত ২০ বছর ধরে ঢাকায় থাকা এ গৃহিনী বলেন: বাসা বাড়ির গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপণা আগের চেয়ে কিছুটা ভালো। এ অবস্থা বজায় থাকলে আরও ভালো কিছু পাবো বলে আশা করি।
নীলক্ষেত মোড়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মামুন ও রুবাইয়া, ইডেন কলেজের নুসরাত এবং ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী আল আমিনের সঙ্গে।
ওই এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করে তারা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: আগে ফুটপাত থাকলেও সেখান দিয়ে পায়ে চলার কোন উপায় ছিল না। কারণ পুরোটাই ছিল হকারদের দখলে। বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হতো। এতে চলাচল করতে যেমন সমস্যা ছিল তেমনি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও ছিল।এখন স্বাভাবিকভাবে চলতে পারায় ভালো লাগছে।
কেউ কেউ আবার বলছেন ফুটপাতের দোকান থেকে সহজে এবং সস্তায় বইপুস্তকসহ নানা প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা যেত। যেটা এখন পারা যাচ্ছে না।
স্বস্তি ফিরে এসেছে নীলক্ষেতের বই দোকানীর মধ্যেও। দেওয়ান স্টোরের সেলিম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: আগে পরিবেশটা এত বদ্ধ ছিল যে দোকানে টিকতে কষ্ট হতো। ফুটপাত পরিস্কার হওয়ায় এখন দোকানে আলো আসছে, বাতাস চলাচল বেড়েছে। পরিবেশও উন্নত হয়েছে। তাই শান্তিতে ব্যবসা করতে পারছি।
ফার্মগেটের পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ী ইউসুফ চৌধুরী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: আগে এই এলাকা দিয়ে হাটার মত কোন পরিস্থিতি ছিল না। এখান থেকে নিউমার্কেট বা ধানমন্ডি এলাকায় যাওয়ার পথে অসহনীয় যানজটে পড়তে হতো। এখন সে অবস্থা কিছুটা সহনীয় হয়ে এসেছে।
ফার্মগেটে একজন চাকরিজীবী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: আমরা ফুটপাত থেকে পণ্য কিনতে পারতাম বটে। কিন্তু সেগুলোর কোয়ালিটি খুবই খারাপ থাকতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্রেতারা প্রতারিত হতেন। তাই আমি মনে করি ফুটপাতের দোকান না থাকাই ভালো।
ফুটপাত চলাচল উপযোগী হওয়ায় রাস্তার যানজট অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে বলে দাবি করেন নিউমার্কেট মোড়ে দায়িত্বরত দুই ট্রাফিক পুলিশ সদস্য।
যুক্তি তুলে ধরে মহসীন এবং রাজু নামের দুই পুলিশ সদস্য চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: লোকজন যখন ফুটপাত দিয়ে হাটতে পারতো না তখন তারা রাস্তায় নেমে যেত। আমরাও তাদের নিবৃত্ত করতে পারতাম না কারণ তাদেরও তো যাওয়া প্রয়োজন। এতে মূল সড়কে যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হতো। এখন সে অবস্থা অনেকটাই কমে গেছে।
পথচারীরা সন্তোষ প্রকাশ করলেও তাদের শঙ্কা আবারও দখলে নেওয়া হবে ফুটপাতগুলো, ফিরে আসবে নগরবাসীর সেই চিরচেনা ভোগান্তি। তবে এ পরিবর্তনগুলোকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যেন এ অবস্থা সবসময় বজায় থাকে।
সাধারণ নগরবাসী এ অবস্থায় স্বস্তি প্রকাশ করলেও ‘অসুবিধায় পড়েছেন’ হকাররা। পুলিশের চোখ এড়িয়ে নীলক্ষেতে কিছু বই নিয়ে ফুটপাতে বসা এক হকার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: খুবই সমস্যায় আছি। বেঁচে থাকাই কষ্টকর হয়ে গেছে। উপায় না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই দোকান নিয়ে বসেছি। কিন্তু ধরা পড়লেই সোজা চালান করে ধরে।
দক্ষিন সিটি মেয়র সাঈদ খোকন উচ্ছেদকৃত হকারদের জন্য হলিডে মার্কেটের কথা বললেও এ হকারের দাবি তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়নি।
ফার্মগেট এবং নিউমার্কেট এলাকায় এখনও কিছু হকারকে বসতে দেখা গেছে। ফার্মগেটে দায়িত্বরত পুলিশ কনস্টেবল নিরঞ্জনের দাবি তাদের চোখ ফাঁকি দিয়েই বসছে এসব হকার।
চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন: ফুটপাত দখলমু্ক্ত রাখতে আমরা সাধ্যমত চেষ্কা করে যাচ্ছি। কিন্তু আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়েও কেউ কেউ বসার চেষ্টা করে। আমরা দেখা মাত্রই তাদের তুলে দিচ্ছি।
দক্ষিনের মেয়র সাঈদ খোকন তার অংশের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন দিক তুলে ধরলেও এ বিষয়ে এখনও কোন বক্তব্য আসেনি উত্তরের মেয়র আনিসুল হকের কাছ থেকে।

