রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থার খোল নলচে পাল্টে দেবার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক। বলেছিলেন রং-চটা, ভাঙাচোরা গাড়ি উঠিয়ে দিয়ে নামানো হবে আধুনিক নতুন বাস। নতুন এই ব্যবস্থা চালু হলে যাত্রীর জন্য আর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামতে হবে না চালকদের।
কাজটা অনেক কঠিন হলেও বাস মালিকদের ঠিকই রাজি করাতে পেরেছিলেন মেয়র। বাসগুলো এক ছাতের নিচে চলবে এমন সিদ্ধান্তে একমত হয়েছিলেন মালিকরা।
মেয়রের পরিকল্পনা ছিল, রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসগুলো ৫-৬ টি কোম্পানির অধীনে চলবে। মানে, কেউ বাস নামাতে চাইলে এসব কোম্পানির অধীনেই নামাতে হবে। বাসের শেয়ার অনুযায়ী মাস শেষে এক সঙ্গে পাওয়া যাবে সমুদয় মুনাফা। মেয়রের ঘোষিত পরিকল্পনায় এক নতুন পরিবহন ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিল নগরবাসী।
অসুস্থ হওয়ার আগে গত ২৪ জুলাই মহাখালীর ডিএনসিসি মার্কেটে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি আয়োজিত বিশেষ সাধারণ সভায় মেয়র আনিসুল হক বলেছিলেন, এক দু’দিনে এই ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব নয়। আমরা সবাই মিলে আস্তে-ধীরে এ ব্যবস্থা চালু করব। তবে এ বছরই কিছু বাস নামবে। সেটা সময় হলেই জানতে পারবেন।
এরপর ২৯ জুলাই চেকআপের জন্য সপরিবারে লন্ডন যান মেয়র। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ১৩ আগস্ট হাসপাতালে চেকআপ করাতে নেওয়া হয় তাকে। চেকআপ করা শেষে বাসায় ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়েন (জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন)। ডাক্তারি ভাষায় একে‘মাইল্ড ব্রেইন স্ট্রোক’ বলা হয়। ১৪ আগস্ট তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর থেকে তিনি এখনো আইসিইউতে আছেন। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে সেরিব্র্যাল ভ্যাসকুলাইটিস বা মস্তিষ্কের রক্তনালীতে প্রদাহজনিত রোগে ভুগছেন।
মেয়রের অসুস্থতার কারণে পরিবহন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনাটি আর বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। বরং তার অনুপস্থিতিতে তার পরিকল্পনা অংকুরেই বিনষ্ট হবার পথে। এ কাজে কোনো গতি নেই সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত অনীহার কারণে। মেয়র দেশের বাইরে যাওয়ার পর এ নিয়ে একটিও মিটিং হয়নি।
এ ব্যাপারে একমত হয়ে উদ্যোগটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। এখন তারাও এ ব্যাপারে হাত গুটিয়ে। বরং এ নিয়ে উল্টো অনীহা ও বিস্ময়ই প্রকাশ পেল তার কণ্ঠে।
এবছরই কিছু বাস নামানো হবে এমন কথা মেয়র বললেও প্রশ্ন শুনে চমকে ওঠেন খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। তিনি বলেন, ‘এবছরই নামবে একথা আমি কখনো শুনিনি। আর এটা সম্ভবও নয়। ঢাকায় ৫টি ডিপো হবে, সেটা এত সহজে সম্ভব হবে না। এবছর তো হবেই না, আগামী বছরেও সম্ভব হবে না। মূল পরিকল্পনাকারী মেয়রই যেহেতু অসুস্থ, তাই আলোচনা যেখানে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে। ’
নতুন বাস নামানোর পরিকল্পনায় ছিল ঢাকা শহরে মোট ৫টি বাস টার্মিনাল থাকবে। বাসের টিকিটের ক্ষেত্রে ই-টিকিটিং ও বাস ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা ছিল। নতুন বাস নামানোর পাশাপাশি পাঁচ বছরের পুরাতন বাস উঠিয়ে নেয়ার চিন্তাভাবনা ছিল।
মেয়রের অনুপস্থিতিতে প্যানেল মেয়র নিয়োগের আগে ডিএনসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইউও) মেসবাহুল ইসলামই যাবতীয় দায়িত্ব পালন করতেন।
‘নতুন বাস নামানোর পরিকল্পনার অগ্রগতি কতদূর এগিয়েছে?’ –বাংলানিউজের পক্ষ থেকে এ প্রশ্ন করা হয় তাকে। এ ব্যাপারে এক বাক্যে জবাব দিলেন তিনি: ‘এবিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারবো না। ’
মেয়রের অনুপস্থিতিতে সবই যেন এখন অতীত। নগরের গণপরিবহনে নতুন দিনের স্বপ্নও যেন ফিকে, বিবর্ণ হয়ে গেছে! সংশ্লিষ্ট সবার কথাতেই যেন একই নেতিবাচকতার প্রতিধ্বনি। তবে কি মেয়র আনিসুলের স্বপ্ন অধরাই থেকে

