রাজধানীর গণপরিবহনকে সুশৃঙ্খল করার জন্য সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পাঁচ বছর আগে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ নামে একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঢাকা উত্তরের তৎকালীন মেয়র আনিসুল হককে প্রধান করে কমিটি করা হয়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রথম দিকে বেশকিছু কাজ হলেও মেয়র আনিসের মৃত্যুর পর তা আর সেভাবে এগোয়নি।
কয়েক বছর ধরে সেই পরিকল্পনা কমিটি আর বৈঠকে ঘুরপাক খাচ্ছে। টার্মিনাল নির্মাণের জন্য এখনও জমি নির্বাচন হয়নি। নির্ধারণ হয়নি এখনও বাস থামানোর স্থানগুলো। পরীক্ষামূলক একটি রুট চালুর সিদ্ধান্ত ফাইলপত্র ছেড়ে এখনও সড়কে বাস্তবায়নের পর্যায়ে আসেনি। ঢাকঢোল পিটিয়ে চালু করা চক্রাকার বাস সার্ভিস বন্ধ হয়ে গেছে অনেকটা নীরবে।
মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন কমিটির দায়িত্ব নিয়ে দুই বছরের মধ্যে ঢাকায় বাসের রুট পুনর্বিন্যাস বা রেশনালাইজেশনের কাজ শেষ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার নেতৃত্বে ৯টি সভা ছাড়া এ পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে সংশ্নিষ্টরা মনে করেন। সাঈদ খোকনের বিদায়ের পর ঢাকা দক্ষিণের নতুন মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস গত মাসে দায়িত্ব নিয়ে বলেন, ‘বলা যায় প্রায় শূন্য থেকে কাজ শুরু করতে হচ্ছে।’ গত বৃহস্পতিবারও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বাস রুট পুনর্বিন্যাসের কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেন। পাঁচ বছরেরও কাজ শেষ না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ঢাকার গণপরিবহনকে সুশৃঙ্খল করতে বাস রুট সংস্কারের বিকল্প নেই। বাস রুট রেশনালাইজেশন করতে হবে। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক কাজ শুরু করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর কাজ আর তেমন এগোয়নি।
ঢাকা মহানগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ২৪৬টি কোম্পানির তিন হাজার মালিকের প্রায় পৌনে আট হাজার বাস চলে ২৭৮টি রুটে। একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাস চলায় যাত্রী পেতে চালকরা মারাত্মক প্রতিযোগিতায় নামেন। এতে সড়ক অনিরাপদ হয়ে পড়ে। সড়ক বন্ধ করে যত্রতত্র যাত্রী তোলায় নিত্য যানজট হয়। ঘটে দুর্ঘটনা। অনেকে শিকার হন অকালমৃত্যুর।
ঢাকার সড়কে বিশৃঙ্খলার জন্য রুট ও বাস কোম্পানির ছড়াছড়িকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় রুট পারমিট দিয়ে গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়ানো হয়েছে।
গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে ২০১৫ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্ব দেন আনিসুল হককে। তাকে প্রধান করে কমিটি হয়। এ কমিটি ঢাকায় রুটের সংখ্যা কমিয়ে ২২টিতে আনা এবং উন্নত দেশের মতো ‘বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি সিস্টেম (বিএফএস)’ এর আদলে ২৪৬টি কোম্পানিকে একীভূত করে ছয়টি বাস কোম্পানি গঠনের প্রস্তাবনা তৈরি করে। পুরোনো বাস তুলে দিয়ে চার হাজার নতুন বাস নামানোর সিদ্ধান্ত হয়। কোম্পানির অধীনে চলা বাসগুলো অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে মুনাফা পাবে বলে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
আনিসুল হকের মৃত্যুর পর এ কার্যক্রম আর সেভাবে এগোয়নি। পরে ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সাঈদ খোকনকে কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘ঢাকা যানবাহন সমন্বয়ক কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ)’। সাঈদ খোকনের নেতৃত্বাধীন কমিটির সিদ্ধান্তে ধানমন্ডি ও উত্তরায় চক্রাকার বাস সার্ভিস চালু ছাড়া উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এ সার্ভিস করোনার সময় বন্ধ হয়ে পড়ে, আর চালু হয়নি। ওই কমিটির শেষ বৈঠকটি হয় গত বছরের ডিসেম্বরে।
প্রায় ১০ মাস পর গত ৬ অক্টোবর শেখ ফজলে নূর তাপসের সভাপতিত্বে বৈঠক হয়। নতুন করে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। টার্মিনাল নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে পরামর্শক নিয়োগের কথা বলেছেন মেয়র।
দায়িত্বের দুই বছরে কোনো কাজ হয়নি তা মানতে নারাজ সাঈদ খোকন। তিনি টেলিফোনে সমকালকে বলেছেন, ‘অনেক কাজই হয়েছে।’ কী কী কাজ হয়েছে তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাগজপত্র দেখে বলতে হবে।’ পরে আর তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রাকিবুর রহমান বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির সদস্য সচিব। কাজে অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি সমকালকে বলেছেন, তারা কাজ অনেক দূরই এগিয়েছেন। পরিকল্পনার কাজ গুছিয়ে এনেছেন। করোনার কারণে গত মার্চ থেকে আর কাজ হয়নি।
বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার আগে পরীক্ষামূলকভাবে বিমানবন্দর থেকে সায়েদাবাদ ভায়া কুড়িল হয়ে পূর্বাঞ্চল-২ রুটে ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতে বাস চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও তা কার্যকর হয়নি। কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ সমকালকে বলেছেন, এখন পর্যন্ত যত কাজ হয়েছে সবই তাত্ত্বিক বা কাগজে-কলমে। বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি।
আনিসুল হকের নেতৃত্বাধীন কমিটিতেও ছিলেন খন্দকার এনায়েত। তিনি বলেছেন, বাস মালিকদের রাজি করানো, টার্মিনাল নির্মাণের স্থান চিহ্নিত করা, পুরানো বাস সরকার কিনে নেওয়া, নতুন বাস কিনতে মালিকদের ব্যাংক ঋণ দেওয়ার সুপারিশসহ অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সড়কে বাস্তব প্রয়োগের কাজ হয়নি। তবে বাস মালিকরা এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগ্রহী। বাস রুটের রেশনালাইজেশন হলে বাসে বাসে অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমবে। যানজট কমবে। মালিকের মুনাফা বাড়বে। যাত্রীরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করতে পারবেন।
ডিটিসিএর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, কমিটিতে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দেখা গেছে, পরের বৈঠকে আবার তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। যারা বৈঠকে যোগ দিয়েছেন তারা প্রস্তুতি ছাড়াই এসেছেন। মতামত দিতে দীর্ঘ সময় নিয়েছেন। এসব কারণে কাজ এগোয়নি। ডিটিসিএ শুধু সাচিবিক দায়িত্ব পালন করছে। মূল কাজ কমিটিকেই করতে হবে।
এই কর্মকর্তা আরও বলেছেন, পাঁচ বছরে টার্মিনাল নির্মাণের জমি, বাস স্টপেজের জায়গা চিহ্নিত করার মতো মৌলিক কাজই হয়নি। পুরোনো বাসের বদলে নতুন বাস নামাতে মালিকরা দুই শতাংশ সুদে ঋণ চান। এ দাবি পূরণের ক্ষমতা কমিটির নেই। কোন রুটে কোন কোম্পানি বাস পরিচালনার লাইসেন্স পাবে, মালিকদের মুনাফা কীভাবে ভাগ হবে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া এর সমাধান সম্ভব হবে না।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেছেন, পৃথিবীর কোনো শহরে এত রুট, এত বাস কোম্পানি নেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় রুট পারমিট দিয়ে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে মেরে ফেলা হয়েছে। ঢাকাকে বাঁচাতে রুট কমিয়ে, রুটভিত্তিক অপারেটরের বাস পরিচালনা যত দ্রুত সম্ভব শুরু করা দরকার। যত দেরি হবে, শহরের তত ক্ষতি হবে। কিন্তু ‘যানজট যাদের ব্যবসা’ সেই শক্তির কারণে আদৌ এ পদ্ধতি চালু হবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান তিনি।
কমিটির সদস্য ডিটিসিএর সাবেক নির্বাহী পরিচালক এসএম সালেহ উদ্দিন সমকালকে জানান, উত্তর সিটির হয়ে তিনি ২০১৬ সালে সমীক্ষা পরিচালনা করেন। কোন রুটে কতগুলো বাস প্রয়োজন, কোথায় বাস স্টপেজ প্রয়োজন, চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের উন্নয়ন, ছয়টি সিটি টার্মিনাল নির্মাণে জায়গা নির্ধারণসহ অনেক কাজ এগিয়ে রেখেছিলেন। এত কাজ এগিয়ে রাখার পরও বাস রুট পুনর্বিন্যাসের কাজ শুরু করতে না পারা দুঃখজনক।

