সাদা কাপড়ে ঢাকাকে নিয়ে স্বপ্নের কথা তুলে ধরেছেন ঢাকা উত্তরের ভোটাররা। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নবগঠিত ঢাকা নাগরিক সমাজের উদ্যোগে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ‘কেমন ঢাকা চাই’ শিরোনামে উত্তরের মেয়র প্রার্থী আনিসুল হকের কাছে খোলা চিঠি লেখার অভিনব আয়োজনে সমবেত হয়েছিলেন হাজারো ভোটার। সাদা কাপড়ের ক্যানভাসে এক-দুই লাইনে তারা নিজেদের দাবি-দাওয়ার কথা তুলে ধরেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আনিসুল হকের কাছে।

সমবেতজনের মধ্যে ছিলেন ইনামুল হকের মতো প্রবীণ অভিনেতা, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক দুই অধিনায়ক রকিবুল হাসান ও হাবিবুল বাশার সুমন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ, তারানা হালিম, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ ও সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফসহ পরিচিত অনেকেই।

ডা. দীপু মনি লিখলেন শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ সর্বস্তরে সুন্দর একটি ঢাকার স্বপ্ন দেখেন তিনি। রকিবুল হাসান ঢাকাকে দেখতে চান ক্রীড়ানগরী হিসেবে। গোলাম কুদ্দুছ চান, মঞ্চনগরী। নাসিরউদ্দীন ইউসুফের আরও অনেক চাওয়ার সঙ্গে রয়েছে রাজাকারমুক্ত ঢাকার স্বপ্ন। আর হাবিবুল বাশার সুমন লিখেছেন, খেলার মাঠ চাই, বিশেষ করে শিশুদের জন্য। অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয় অবশ্য একবাক্যে আনিসুল হককে মেয়র হিসেবে দেখতে চেয়েছেন, এটাই তার চাওয়া। পরে অবশ্য সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে জয় বললেন, তার বিশ্বাস আনিসুল হকের মতো মানুষ মেয়র নির্বাচিত হলে সব সমস্যার সমাধানে আন্তরিক প্রয়াস চালাবেন।

বিখ্যাতজনেরা যখন তাদের স্বপ্নের কথা লিখে জানাচ্ছিলেন, তখন থমকে দাঁড়ালেন অনেক পথচারীও। তাদের একজন মিরপুরের বাসিন্দা শিহাব। দশজনের মতো এক লাইনে শেষ করেননি তিনি তার চাওয়া। সবুজ কালিতে শিহাব লিখেছেন, ‘দুর্নীতিমুক্ত সুন্দর সমাজ চাই, বেকারত্বমুক্ত ঢাকা চাই, আবর্জনামুক্ত ঢাকা চাই।’ মিরপুরবাসীর জন্যও বিশেষ কিছু দাবি-দাওয়া রয়েছে শিহাবের। তিনি মিরপুরে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারও দাবি জানিয়েছেন।

জান্নাত নামের এক তরুণী আনিসুল হকের কাছে দাবি করেছেন, তিনি মেয়র নির্বাচিত হয়ে যেন যাতায়াত ভাড়া কমানোর উদ্যোগ নেন। জনতার দাবির মধ্যে ছিল_ নারী ও শিশু নির্যাতন এবং যৌন হয়রানি বন্ধের দাবি। অনেক নারী তার কাছে তাদের জন্য যাতায়াতের জন্য আলাদা যানবাহনের দাবিও তুলেছেন। সবুজ ঢাকা গড়ার কথা বলার পাশাপাশি ঢাকার চারপাশের চারটি নদীকে কেন্দ্র করে যেন জলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয় সে দাবিও জানানো হয়েছে।

এসব দাবির মধ্যে একান্তই ব্যক্তিগত একটি চাওয়ার কথা লিখে রেখে গেলেন জনৈক মো. সজীব খান। গোটা গোটা অক্ষরে তিনি লিখেছেন_ ‘আমি আনিসুল হক সাহেবের কাছে একটা চাকরি চাই।’ কৌতুকের মতো শোনালেও অনেক ভোটারই আনিসুল হকের কাছে বেকারত্ব দূর করার একান্ত ব্যক্তিগত দাবি জানিয়েছেন। তবে আরও অনেকে বলেছেন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কথা।

খোলা চিঠি লেখা শুরু হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর সেখানে আসেন আনিসুল হক। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী রুবানা হক। প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ ভোটারদের স্বপ্নের কথা একনজরে দেখে দাঁড়ালেন কথা বলতে। তিনি বললেন, গত ২১ দিন ধরে ঢাকাবাসীর সমস্যার কথা শুনছি। তাদের চাওয়া-পাওয়া আর স্বপ্নের কথা অনেকটাই আমার জানা আছে। এক কিলোমিটার দীর্ঘ স্বপ্নের কথা দেখে নিজের মধ্যে আরও শক্তি পাচ্ছি।

ঢাকা উত্তরের ২৪ লাখ ভোটারকে একটি পরিবার উল্লেখ করে আনিসুল হক বলেন, ‘এই বৃহৎ পরিবারের সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচিত হচ্ছি। তাদের কথা শুনছি। তাদের এসব স্বপ্নের সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করব, যাতে ঢাকাবাসী আগের চেয়ে একটু ভালো থাকতে পারেন।’

নিজের স্বপ্নের ঢাকার কথা লেখার এ আয়োজনটি অব্যাহত রাখা হবে বলে ঢাকা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব গোলাম কুদ্দুছ জানালেন। এর আগে গতকাল সকালে মিরপুরের সাংবাদিক কলোনি এলাকা থেকে আনিসুল হক তার তৃতীয় দিনের প্রচার শুরু করেন। এখানে তিনি বস্তিবাসীর উন্নয়নে কর্মরত ‘এনডিবাস’ নামক একটি বেসরকারি সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সংগঠনের নেতারা ঢাকা উত্তরের বস্তিবাসীর প্রতিদিনকার সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। তারা জানান, বস্তি উচ্ছেদে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বস্তিবাসীর প্রতিটি মুহূর্ত কাটে উচ্ছেদ আতঙ্কে। এ সময় আনিসুল হক নির্বাচিত হলে দরিদ্র ও বস্তিবাসীর জন্য সরকারের সহযোগিতায় স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসম্মত, নিরাপদ বসতির ব্যবস্থা করবেন বলেও আশ্বাস দেন।

এরপর আনিসুল হক যান মিরপুর ১২ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে মোল্লাহ মার্কেটে। সেখানে তিনি পাইওনিয়ার গার্মেন্টের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তার সঙ্গে স্থানীয় সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। এখানে আনিসুল হককে সমর্থন জানাতে হাজির হন লাক্স তারকা ও অভিনেত্রী বাঁধন। এখানে আনিসুল হক বলেন, ‘আমার পেশাগত জীবন শুরু হয়েছিল গার্মেন্ট দিয়ে। গার্মেন্টই এখনও আমাদের মূল ব্যবসা। আমার যা অর্জন তার মূল কৃতিত্ব গার্মেন্টের এই শ্রমিক ভাই-বোনদের। আমি আপনাদেরই প্রতিনিধি।’

এদিকে নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আনিসুল হক তার নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দাদের জন্য গণমাধ্যমে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। এতে সবুজ পরিচ্ছন্ন মানবিক নগরী গড়ে তোলার লক্ষ্যে ভোট চেয়েছেন তিনি।