ব্যবসায়ী থেকে টেলিভিশন উপস্থাপক, সেখান থেকে রাজনীতিবিদ, রাজধানীর একাংশের নগরপিতা- এত সব পরিচয়ের বাইরেও প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক ছিলেন একজন সংস্কৃতিজন। সুন্দরের কথা বলে

যাওয়া সজ্জন এই মানুষটিকে হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে স্মরণ করলেন দেশের অগ্রগণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা।

শিল্পীদের অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণে আনিসুল হকের গড়ে তোলা ‘শিল্পীর পাশে ফাউন্ডেশন’ গতকাল বুধবার বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘অমেয় ভালোবাসার নিবেদনে’ শিরোনামে আয়োজন করে স্মরণসভা। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।

বিশেষ অতিথি ছিলেন ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ব্যবসায়ী অঞ্জন চৌধুরী, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম, জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ, কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী, টিভি ব্যক্তিত্ব নওয়াজেশ আলী খান, শিল্পীর পাশে ফাউন্ডেশনের মহাসচিব ব্যারিস্টার ওমর সাদাত প্রমুখ।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আবদুন নুর তুষার।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই সদ্যপ্রয়াত কণ্ঠশিল্পী শাম্মী আখতার ও আনিসুল হকের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর একক কণ্ঠে খায়রুল আনাম শাকিল ‘মৃত্যু নাই, দুঃখ নাই, আছে শুধু প্রাণ’, বুলবুল ইসলাম ‘তুমি রবে নীরবে’ ও শারমিন সাথী ইসলাম ময়না গেয়ে শোনান ‘সবারে বাসো ভালো’।

আসাদুজ্জামান নূর বলেন, শিল্পীদের জন্য আনিসুল হক ছিলেন একটি বটবৃক্ষের মতো। শিল্পীরা তাদের সংকটের সময় ভরসা করার মতো একটি নিরাপদ জায়গা পেয়েছিলেন।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর মানুষটি কয়েক মাসের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যাবে এটা বিশ্বাস করা কঠিন। মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে তার মধ্যে ছিল সাহস আর সংকল্প। সাধারণ মানুষের জন্য ছিল তার অসম্ভব দরদ।

রুবানা হক বলেন, আমার চারপাশে আনিস এখনও আছেন। পরিবারের প্রতিটি মানুষ আমরা অপেক্ষায় থাকি, কোনো এক সময় আনিস দরজা দিয়ে ঢুকবে। আমার ছেলেমেয়েরা যখন কথা বলে, আমি আনিসকে খুঁজে পাই।

নিজেদের প্রণয় আর দাম্পত্য জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রুবানা বলেন, আমি আনিসের সবচেয়ে বড় সমালোচক, তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষীও আমি। এ সময় তিনি আগামী মাসে আনিসুল হকের টিভি চ্যানেল ‘নাগরিক’ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করবে বলে জানান।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, আনিস ছিল আমাদের তারকা। টিভি অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যবসা, তারপর সমাজহিতকর কাজ, সবকিছুতেই সে ছিল তারকা। সে বেঁচে থাকলে এই ঢাকাকে সে একদিন পৃথিবীর সেরা শহরগুলোর সমকক্ষ হিসেবে ঠিকই গড়ে তুলত।

সেলিনা হোসেন বলেন, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের মাধ্যমে আনিস সমাজ পরিবর্তনের চিন্তা করত, স্বপ্ন দেখত। আমাদের উন্নয়ন তো শুধু ইট, কাঠ, পাথরের মাধ্যমে নয়। সে বিশ্বাস করত, সৃজনশীল মানুষের জ্ঞানের জায়গা থেকেই উন্নয়ন আসবে।

জুয়েল আইচ বলেন, আনিস সবসময় বলতেন, তিনি অদ্ভুত কিছু করবেন, আলাদা কিছু করবেন। সবকিছুর শেষটা তিনি দেখতে চাইতেন। আনিস অনেক কথা বলে যেতে পারেননি। যদি বলে যেতে পারতেন, তবে বিশ্ব দেখত এখানেও একজন তেজি মানুষ জন্মাতে পারে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে রাজনীতিতে যে নেতৃত্বের আদর্শ রেখে গেছেন, তা যদি আজকের রাজনীতিবিদরা ধারণ করতে পারেন, তবে বাংলাদেশ হবে বিশাল এক দেশ। গোটা ঢাকা শহরের দেয়ালকে চিত্রকলায় সুসজ্জিত করার পরিকল্পনা করেছিলেন আনিস। তার মধ্যে এক নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখেছি, তার মন ছিল তারুণ্যমণ্ডিত।

সৈয়দ আবদুল হাদী বলেন, স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে তিনি প্রমাণ করে গেছেন সততা, দক্ষতা, আন্তরিকতা যোগ্যতা থাকলে কোনো কিছু করা অসম্ভব নয়। তার অকাল প্রয়াণে গোটা দেশবাসী হারাল এক সুহৃদকে।

নওয়াজেশ আলী খান বলেন, আমার দেখা উপস্থাপকদের সেরা তিন পারফেকশনিস্টদের একজন আনিসুল হক।

আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ঢাকা উত্তরে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী আতিকুল ইসলাম বলেন, আজকে আমাকে প্রশ্ন করেন, সুন্দর আগামীর ঢাকা কীভাবে গড়ে তুলব। আমি তো মনে করি, আনিস ভাই যে এজেন্ডা ও ম্যানিফেস্টো ঠিক করে গেছেন, তার প্রতিটি অক্ষর মেইনটেইন করতে পারলেই হলো। জুয়েল আইচ জাদু দেখান, আনিস ভাই সে জাদু সত্যি করে দেখিয়ে গেছেন।