এই তো সেদিন ঢাকার (উত্তর) মেয়র হলেন তিনি- স্বপ্ন দেখেছিলেন ঢাকা হবে কল্লোলিনী তিলোত্তমা। নগরবাসীও দেখেছিল সেই স্বপ্ন। মাত্র আড়াই বছরে এমন স্বপ্নযাত্রা সফল করা সম্ভব নয়। তবে তিনি যে তা করতে পারেন- তেমন নানা দৃষ্টান্ত আর উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ঢাকাবাসীর প্রিয়তম নগরপিতা হয়ে উঠেছিলেন তিনি। চারশ’ বছরের নগর ঢাকায় আনিসুল হকের আগে অন্য কোনো নগরপিতা জনপ্রিয়তার এমন চূড়া স্পর্শ করতে পারেননি- তার শেষযাত্রায় নগরের আপামর মানুষের অশ্রুসিক্ত উপস্থিতিই নীরবে প্রতিষ্ঠিত করল এই সত্য। গত শনিবার বিকেল ৫টা ১২ মিনিটে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হকের দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে বিকেল সোয়া ৪টায় রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে হয় তার দ্বিতীয় জানাজা।
এ সময় তার ছেলে নাভিদুল হক সমবেত জনতার উদ্দেশে বলেন, তার পিতা ছিলেন একজন শৌখিন মানুষ। তিনি সব সময় ভালো কাজ করার চেষ্টা করেছেন। সততার সঙ্গে সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। কাজ করতে গিয়ে তিনি যদি কারও মনে কষ্ট বা দুঃখ দিয়ে থাকেন, সেসব ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানান নাভিদুল হক। বনানী কবরস্থানে পাশাপাশি তিনটি কবর রয়েছে প্রয়াত মেয়রের মা, শাশুড়ি ও প্রিয় সন্তান শারাফুল হকের। বিকেল ৫টা ১২ মিনিটে প্রিয় সন্তান শারাফুলের কবরে দাফন করা হয় অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে জনপ্রিয় নেতা হয়ে ওঠা আনিসুল হককে।
নাভিদুল হক জানিয়েছেন, আগামী ৬ ডিসেম্বর বুধবার গুলশানের আজাদ মসজিদে বাদ আসর তার প্রয়াত পিতার কুলখানি হবে। কুলখানিতে আনিসুল হকের গুণগ্রাহীদের উপস্থিত হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার মৃত্যুর পর লন্ডনে তার প্রথম জানাজা শেষে শনিবার দুপুর ১টায় বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে (বিজি ০০২) লন্ডন থেকে ঢাকায় আনা হয় আনিসুল হকের মরদেহ। সঙ্গে আসেন আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক, ছেলে নাভিদুল হক, দুই মেয়ে ওয়ামিক উমায়রা ও তানিশা ফারিয়াম্যান হক। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার ছোট ভাই সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক মরদেহ গ্রহণ করেন। তার সঙ্গে ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল আলম মহিউদ্দিন, বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানসহ ডিএনসিসির শীর্ষ কর্মকর্তারা। এর পর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বনানীতে আনিসুল হকের বাসভবনে।
বনানীর বাসভবনে প্রধানমন্ত্রী :বনানীর বাসভবনে শোকসন্তপ্ত মেয়রের পরিবারের কাছে ছুটে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আনিসুল হকের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া পাঠ করেন তিনি। পরে পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে তিনি একান্তে সময় কাটান ও তাদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক। খবর পেয়ে সেখানে জড়ো হন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজার হাজার মানুষ। ছুটে যান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলীয় নেতারা, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ অনেকেই।
পুত্রের মরদেহের পাশে পিতা :আনিসুল হকের পারিবারিক সূত্র জানায়, তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে- এমন বিবেচনায় তার গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুসংবাদ তার পিতা অসুস্থ পিতা ৯০-ঊর্ধ্ব শরিফুল হককে সঙ্গে সঙ্গে জানানো হয়নি। তবে শনিবার দুপুরের পর ক্যান্টনমেন্টের সেনাপ্রধানের বাসা থেকে আইসিইউ সুবিধাসম্পন্ন একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে বনানীর বাসভবনে নেওয়া হয়। এ সময় তার নাকে নল লাগানো ছিল। অ্যাম্বুলেন্স থেকে হুইল চেয়ারে করে প্রিয় সন্তানের মরদেহের কাছে যান নবতিপর বৃদ্ধ শরিফুল হক। সন্তানকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কাঁদেন তিনি।
অসুস্থতার কারণে কিছুদিন ধরেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তিনি। লন্ডনে আনিসুল হক অসুস্থ হয়ে পড়ার পর অপর পুত্র সেনাপ্রধান আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হকের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। কখনও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, কখনও বা বাসায় শরিফুল হকেরও চিকিৎসা চলছে। মৃত পুত্রের পাশে পিতার উপস্থিতির এ হৃদয়বিদারক দৃশ্যে উপস্থিত রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দসহ সবার চোখ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ে জল।
দল-মতের ঊর্ধ্বে থাকা এই মানুষটিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাজনীতিক, সংস্কৃতিবিদ, শিক্ষক, আমলা থেকে শুরু করে নগরের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা পর্যন্ত ছুটে যান তার বনানীর বাসাতে। সেখান থেকে মেয়রের মরদেহ আর্মি স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়ার পর এক সময় অনুভূত হয় রাজধানীর সব পথ যেন সেখানে থমকে দাঁড়িয়েছে। অনেকের চোখ থেকে অঝোরে ঝরতে থাকে অশ্রুধারা। ফুলে ফুলে ঢেকে যায় তার কফিন।
মানুষের ঢল :বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যাতে শ্রদ্ধা জানাতে পারেন, সে জন্য বিকেল পৌনে ৪টার দিকে আনিসুল হকের মরদেহ নেওয়া হয় আর্মি স্টেডিয়ামে। তবে তার আগেই স্টেডিয়ামের বাইরে সাধারণ মানুষের ঢল নামে। স্টেডিয়ামের চারটি ফটক দিয়ে হাজারো মানুষ সারিবদ্ধভাবে হেঁটে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন। সেখানে প্রিয় নগরপিতাকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তারা।
এ সময় রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুুল হামিদের পক্ষে সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সরোয়ার হোসেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদিন, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর পক্ষে ক্যাপ্টেন মোশতাক আহমেদ, আওয়ামী লীগের পক্ষে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন শ্রদ্ধা জানান। বিজিএমইএ, এফবিসিসিআই, বিকেএমইএসহ সর্বস্তরের সংগঠন ও মানুষের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় সিক্ত হন তিনি। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্য, ব্যবসায়িক নেতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ সাধারণ মানুষ- সবাই একে একে শ্রদ্ধা জানান।
সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও শ্রদ্ধাঞ্জলি দেন। পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আনিসুল হকের পারিবারিক বন্ধু ডা. আবদুন নূর তুষার। অনুষ্ঠান তদারকির দায়িত্বে ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পর সেখানেই তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
বিভিন্ন কর্মসূচি :আনিসুল হকের মৃত্যুতে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ তিন দিনের ছুটি ও শোক ঘোষণা করে। এ ছাড়া গতকাল রোববার ডিএসসিসির প্রধান কার্যালয়সহ পাঁচটি আঞ্চলিক কার্যালয়ে অর্ধদিবস ছুটি ঘোষণা করা হয়। ডিএনসিসির প্রধান কার্যালয়সহ আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোও ছিল বন্ধ। পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা গতকাল নগরপিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক ঘণ্টা বেশি কাজ করে নগর পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা চালান।
গতকাল সরেজমিন ডিএনসিসি কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শোক ও শ্রদ্ধা জানানো ব্যানারে প্রধান কার্যালয়ের সামনের অংশ প্রায় ঢেকে গেছে। ডিএনসিসি জানিয়েছে, আজ সকাল ৯টায় মেয়রের অফিস কক্ষ স্মৃতি ধারণের লক্ষ্যে ফটো সাংবাদিক ও টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা পারসনদের কাছে এক ঘণ্টার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে মেয়র নির্বাচিত হন জনপ্রিয় উপস্থাপক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হক। নগরীর উন্নয়নে নাগরিকবান্ধব বিভিন্ন ভূমিকার মধ্য দিয়ে আলোচিত হন তিনি। তবে বেশ কয়েক মাস আগে থেকে তিনি মাথায় যন্ত্রণা বোধ করছিলেন। বাংলাদেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করিয়েছিলেন। যদিও চিকিৎসকরা কিছু ধরতে পারেননি। গত ২৯ জুলাই ব্যক্তিগত সফরে সপরিবারে যুক্তরাজ্যে যান মেয়র আনিসুল হক। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে লন্ডনে ন্যাশনাল নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মস্তিস্কের রক্তনালীতে প্রদাহজনিত রোগ সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিস ধরা পড়ে। চিকিৎসার এক পর্যায়ে তাকে আইসিইউ থেকে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সপ্তাহখানেক আগে আবারও অসুস্থ হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ২৩ মিনিটে সবাইকে কাঁদিয়ে চিরদিনের জন্য বিদায় নেন আনিসুল হক।

