ভোটের দিন কি একটু দ্রুতই এগিয়ে আসছে। এমনটিই মনে করছেন সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী মেয়র ও কাউন্সিলর পদপ্রার্থীরা। তাই তাদের কাছে দিনরাত একাকার হয়ে গেছে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ‘মান্যবর ভোটারে’র দরজায় হাজির প্রার্থীরা। তাদের ধুমধাড়াক্কা প্রচারের সাক্ষী হয়ে থাকার জন্য এই প্রতিবেদক গতকাল শুক্রবার প্রায় সারাদিনই ছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী আনিসুল হকের সঙ্গে। ‘৬৩ বছরের তরুণ’ আনিসুল হকের নির্বাচনী প্রচার তরিকা অন্যদের চেয়ে কিছুটা আলাদা। মজা করে কথা বলতে পারঙ্গম আনিসুল হক। কখনও কৌতুকভরে, কখনও ভারিক্কি চালে। ভোর সাড়ে ৬টার মধ্যেই কথা ছিল উত্তর সিটির শেষ প্রান্ত মোহাম্মদপুরের বছিলায় যাবেন তিনি। সেখানে বিডি সাইক্লিস্ট নামের একটি সংগঠনের দেড়শ’ সাইকেল আরোহীকে নিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করবেন তিনি।
সাইক্লিস্টরা বছিলায় পেঁৗছুতে দেরি করলে সকাল ৯টার দিকে সেখানে যান আনিসুল। তখন থেকেই এই প্রতিবেদক ছিল তার প্রচারসঙ্গী। উড়ছে পাখি দিচ্ছে ডাক, দেয়াল ঘড়ি মার্কা জিতে যাক বছিলায় ঝটিকা গণসংযোগ এবং পরে বুড়িগঙ্গা তৃতীয় সেতুর প্রবেশ মুখে অনির্ধারিত পথসভার মাধ্যমে প্রচার শুরু করেন তিনি। তাকে স্বাগত জানান আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি। এরপর তিনি হেঁটে মহল্লায় গিয়ে বাজার ঘুরে নগরবাসীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ সময় যুবকরা তার সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দোয়া করেছেন বয়স্করা।
পথসভায় ছিল উপচেপড়া ভিড়। অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে আনিসুল হককে ভোট দেওয়ার অনুরোধ করলে পথসভায় স্লোগান ওঠে, ‘উড়ছে পাখি দিচ্ছে ডাক, দেয়াল ঘড়ি মার্কা জিতে যাক।’ দেয়াল ঘড়ি আনিসুল হকের প্রতীক।নির্বাচিত হলে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে বছিলায় পার্ক নির্মাণের অঙ্ গীকার ব্যক্ত করে আনিসুল হক বলেছেন, ‘যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রার্থীকে ভোট দিন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে সমর্থন দিয়েছেন। আর সরকার সমর্থকদের পক্ষে উন্নয়নমূলক কাজ করা অনেকটা সহজ। তাই ঢাকার উন্নয়নে সুযোগ চাই। সবুজ ঢাকা গড়তে চাই।’ সভাপতি হিসেবে এফবিসিসিআই ও বিজিএমইএ পরিচালনার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি আরও বলেছেন, ‘জীবনে অনেক সংগ্রাম ও কষ্ট করেছি বলেই এখন আমরা প্রায় ১৫ হাজার কর্মজীবী মানুষ একই ছাদের নিচে কাজ করছি। আমার বিরুদ্ধে অসততার বদনাম নেই।’
পথসভার পর গণ চা পানের সুযোগে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দেন সদা প্রাণবন্ত ও হাস্যোজ্জ্বল আনিসুল হক। আড্ডা দিতে তার জুড়ি পাওয়া কঠিন।
মেয়র হলে সাইকেল চালাবেন পথসভার পর বুড়িগঙ্গা তৃতীয় সেতুর কেরানীগঞ্জ প্রান্ত থেকে মানিক মিয়া এভিনিউতে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে সাইকেল চালিয়ে আসেন আনিসুল হক। শৌখিন সাইকেল চালকদের সংগঠন ‘বিডি সাইক্লিস্ট’ তাদের দেড়শ’তম রাইড উইক উপলক্ষে এই সাইকেল র্যালির আয়োজন করে। দেড়শ’ সাইকেল চালকের পুরোভাগে ছিলেন গাঢ় সবুজের ওপর টকটকে লাল বৃত্তের গেঞ্জি পরিহিত আনিসুল হক। হাতে ছিল জাতীয় পতাকা। তিনি মানিক মিয়া এভিনিউতে পেঁৗছালে উপস্থিত জনতা ও যানবাহনের যাত্রীরা করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। মাত্র ৬ কিলোমিটারের রাস্তা পেরুতে তার সময় লাগে ৩৭ মিনিট। ‘কেন এত সময় লাগল’ এই জিজ্ঞাসার জবাবে তিনি যানজটকে দুষেছেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে আনিসুল হক বলেছেন, তিনি ৪০ বছর পর সাইকেল চালালেন। মেয়র হলে তিনি সাইকেল চালাবেন। সাইকেলের জন্য আলাদা লেন করবেন।
বিজয় সম্পর্কে জানতে চাইলে আনিসুল হকের তাৎক্ষণিক জবাব, ‘আমাকে ঘিরে চারদিকে উৎসাহ দেখুন। তরুণরা ভুল করে না। তারা অবশ্যই সৎ, যোগ্য, স্বচ্ছ ও একনিষ্ঠ কর্মঠ ব্যক্তিকেই বেছে নেবেন।’ এই চার যোগ্যতা তার রয়েছে বলে আনিসুল হকের দাবি। তবুও বিনয়ী আনিসুল হক বলেন, ‘ভালো লাগলে আমাকে ভোট দিন। আমার চাইতে কোনো প্রার্থী যোগ্য হলে তাকেই ভোট দিন।’
সাইকেল চালানোর পর সুজনের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে আনিসুল হক গুলশানে যানজটে আটকা পড়েন। সেখানে গাড়ি রেখে এক দৌড়ে অনুষ্ঠানস্থলে পেঁৗছান আনিসুল হক। সেখানে মেয়র প্রার্থী আবদুল্লাহ আল কস্ফাফীর তোপের মুখে পড়েন তিনি। দেরিতে আসায় ক্ষোভ ঝাড়েন কস্ফাফী রতন।
তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলেন, ‘দেরিতে আসার জন্য দুঃখিত। এ জন্য কেউ আহত হলে ক্ষমা করবেন।’ তিনি নগরবাসীর উদ্দেশে তার লেখা চিঠি পড়ে শুনিয়ে বলেছেন, ‘সততার সুনাম নিয়ে জীবনের সঙ্গে মিশে ঢাকাকে চেনার চেষ্টা করেছি। তাই জনগণ সুযোগ দিলে আরেকটু স্বস্তির ঢাকা এবং আরেকটু নিরাপদ ঢাকা গড়ব ইনশাল্লাহ।’
প্রশ্নোত্তর পর্বে উত্তরার ভোটার কানিজ ফাতেমা জানতে চান, আনিসুল হক একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীরা মুনাফা করেন। তাই নির্বাচনে তিনি যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছেন, বিজয়ী হলে সেই অর্থ কীভাবে তুলবেন? মৃদু হেসে আনিসুল হকের জবাব, প্রায় ৩০ বছরের ব্যবসায়িক জীবনে সৎ হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। তিনি সহজ-সরল মানুষ। এক সময় বাবার প্যান্ট রিপু করেছিলেন তার মা। ব্যবসায় লোকসানও দিয়েছেন। তবে এখন নির্বাচনে খরচ করার মতো অর্থ তার আছে। এই টাকা সিটি করপোরেশন থেকে নেওয়ার চিন্তাও তার নেই। তিনি নির্বাচিত হলে স্ত্রী ও সন্তানরা তার কোম্পানি চালাবেন। তিনি থাকবেন ঢাকাবাসীর জন্য।
এ অনুষ্ঠানের পর উৎসাহী দর্শকরা আনিসুল হককে ঘিরে ধরেন। এ সময় তিন মেয়র প্রার্থী মাহী বি চৌধুরী, কস্ফাফী রতন ও জুনায়েদ সাকির সঙ্গে করমর্দন করে তিনি কস্ফাফী রতনের উদ্দেশে বলেন, ‘দেরিতে আসায় আমি দুঃখিত। তবে সাইকেল চালানোর সময় যানজট এবং তার দুই সাইকেল চালক সহকর্মী অসুস্থ হয়ে পড়ায় দেরি হয়েছে।’ জুনায়েদ সাকিকে বলেন, ‘যদি তোমার মতো স্মার্ট হতাম।’
জনগণের সেবা করতে চাইছি জুমার নামাজ আদায়ের জন্য আনিসুল হক মিরপুরের কাজীপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে পেঁৗছালে তাকে স্বাগত জানান মুসলি্লরা। মসজিদের মিম্বরের সামনে গেলে খতিব মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাকে পরিচয় করিয়ে দেন। এ সময় সাদা ও সুন্দর মনের মানুষ হিসেবে আনিসুল হকের জন্য দোয়া চান স্থানীয় এমপি কামাল আহমেদ মজুমদার, ১৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী রেজাউল হক ভূঁইয়া বাহার ও মসজিদ কমিটির সভাপতি মাহতাব উদ্দিন আকন্দ।
আনিসুল হক মুসলি্লদের কাছে দোয়া চেয়ে বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ আমাকে অনেক দূর এনেছেন। তাই আপনাদের দোয়াই আমার প্রাণশক্তি। আমি রাজনীতি নয়, জনগণের সেবা করতে চাইছি।’ নামাজ আদায়ের পর তিনি মসজিদ উন্নয়নের জন্য ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেন। মিছিল এবং যানজট নামাজ আদায়ের পর আনিসুল হক মসজিদের বাইরে এলে হঠাৎ দৃশ্যপট বদলে যায়। মুসলি্লদের পাশাপাশি শত শত মানুষ তাকে এক নজর দেখার জন্য ছুটে আসে। এক পর্যায়ে তারা আনিসুল হককে সঙ্গে নিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিছিল শুরু করে। এ সময় দুই মিনিটের জন্য যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। পরে মিছিলকারীরা রাস্তার এক পাশে সরে গেলে যানবাহন চলাচল শুরু হয়।
এর কিছুক্ষণ পর আবার যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জহিরুল ইসলাম সুমনের সমর্থকরা আনিসুল হকের নেতৃত্বাধীন মিছিল ডিঙ্গিয়ে সামনের দিকে গিয়ে রাস্তাজুড়ে মিছিল শুরু করলে যানজটে আটকা পড়ে শত শত যানবাহন। এ কারণে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার ক্রিকেট খেলা দেখতে শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে যাওয়ার বেলায় অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েন হাজার হাজার দর্শক।
এর আগেই সেনপাড়া পর্বতা এলাকায় পরিচ্ছন্ন, সবুজ, নিরাপদ, স্মার্ট, আলোকিত ও মানবিক ঢাকার জন্য টেবিল ঘড়ি মার্কায় ভোট চেয়ে মিছিল শেষ করেন আনিসুল হক। তখন দুপুর আড়াইটা। গাড়িতে উঠেই রেডিওতে ক্রিকেট খেলার ধারা বিবরণীতে মনোযোগী হন ক্রিকেটভক্ত আনিসুল হক। তখন বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা দুর্দান্ত খেলছিলেন। আনিসুল হক বলছিলেন, ‘বাংলাদেশ জিতবে। জনগণ ভোট দিলে আমিও জিতব।’
এরপর বিকেলে বাড্ডার ডুমনি ও শিমুলতলী এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শেষ করেন আনিসুল হক। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য রহমতউল্লাহ।

