ঢাকা: ঢাকাকে আধুনিক প্রযুক্তির সমস্ত সুবিধা দিয়ে ‘সবুজ ও স্মার্ট’ ঢাকা গড়তে চান মেয়র পদপ্রার্থী আনিসুল হক। বাংলানিউজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে নিজের এ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ওই প্রার্থী।
তিনি মনে করেন, ঢাকা নতুন নয়, পুরাতন নগরী। ঢাকাকে তিলোত্তমা করা খুব মশকিল। কিন্তু ঢাকাকে একটি স্মার্ট নগর হিসেবে গড়ে তোলা আসলেই সম্ভব। সেজন্যে ঢাকাকে আধুনিক প্রযুক্তির সমস্ত সুবিধা দিয়ে তৈরি করা হবে। এ কাজের সারথী হিসেবে বেছে নিচ্ছেন তরুণ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের। তার ধারণা, তরুণরাই আগামী প্রজন্মের ঢাকা তৈরিতে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।
আনিসুল হক পেশায় একজন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র নির্বাচিত সভাপতিও ছিলেন। গত মাসে প্রধানমন্ত্রী তাকে ডেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। তাই তিনি এরই মধ্যে নেমে পড়েছেন মাঠে। চিহ্নিত করেছেন নগরের নানা সমস্যা। সমাধানের প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিজেকে উপস্থাপন করছেন জনতার কাছে।
তিনি বলেন, একটি বড় কাজ করতে চাই। ঢাকাকে সবুজ ঢাকা বানাতে চাই। ঢাকার তাপমাত্রা আশপাশের চেয়ে ৪-৫ ডিগ্রি বেশি। কারণ, ঢাকায় মানুষ বেশি। গাড়ি-ঘোড়া বেশি। মানুষের চলাচল বেশি। বর্জ্য বেশি। বিদ্যুতের বিকিরণ বেশি। এটি আল্টিমেটলি মানবস্বাস্থ্যের ওপর যে প্রভাব ফেলছে আমরা তা চোখে দেখতে পাচ্ছি না। ২০-৩০ বছর পরে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে আসবে। আমি অনেকজনের সঙ্গে এটা নিয়ে কথা বলেছি, যারা এর পেছনে কাজ করছেন। খুব সম্ভব আমরা এখানে সফল হব।
মেয়র নির্বাচিত হলে আনিসুল হকের অগ্রাধিকারে থাকবে; ক্লিন, ঝকঝকে তকতকে ঢাকা। বর্জমুক্ত ঢাকা । আলোকিত ঢাকা। নিরাপদ ঢাকা।
‘সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পরিকল্পনা কখন থেকে?’—জানতে চাওয়া হয় তার কাছে। জবাবে এই ব্যবসায়ী বলেন, সিটি নির্বাচনে আসার পরিকল্পনা কোনোদিনই ছিল না। প্রধানমন্ত্রী ভেবেছেন, বাইরে থেকে কাউকে এনে দায়িত্ব দেবেন। যাতে ভালো ফল আসবে। তিনি সব সময়ই খুবই কার্যকরী চমক দিয়ে থাকেন, এটিও সেসবেরই একটি। তাঁর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে, আমি সেটা গ্রহণ করেছি। ঢাকা শহরকে গড়ার দায়িত্ব নিয়েছি।
‘মাঠের রাজনীতিকদের সঙ্গে টিকে থাকতে পারবেন কি?’ –জবাবে আনিসুল হক বলেন, কোনো রাজনীতিকের সঙ্গে আমার প্রতিযোগিতা নেই। কারণ রাজনীতিকরা সারাজীবন একভাবে জনসাধারণের সেবা করেছেন, করছেন। আমাদের কার্যক্ষেত্র একটু ভিন্ন। আমরাও মানুষের সেবা করি, কিন্তু ব্যবসা প্রসারের মাধ্যমে। সিএসআর এবং কর্মসংস্থানের মধ্য দিয়ে। তবুও আমার ব্যক্তিগত জীবনে ব্যবসায়ীদের অনেক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেছি। সেগুলোতে, অনেকের মতে, আমি খুব খারাপ কাজ করিনি। কিছু কিছু ভালো কাজও করেছি। এ কারণেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভেবেছেন, আমার মত কাউকে দিয়ে হয়ত এ ঢাকা শহরের কিছু কাজ ভালো হলেও হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সমর্থনকে ‘দায়িত্ব’ পালনের সুযোগ মনে করেন এই ব্যবসায়ীনেতা। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সমর্থনকে আমি কাজ করার বা দায়িত্ব পালনের বিরাট সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করছি। কারণ, এমনিভাবে এতো বড় একটি কাজের মধ্যে সরাসরিভাবে আমি কখনো যেতে পারতাম না। এ সিদ্ধান্ত কতটুকু সঠিক, সেটাকে পরিমাপ করার শক্তিও আমার নেই। সরকার যিনি চালান; তিনি অনেক উপর থেকে দেখতে পান, বুঝতে পারেন। তার সিদ্ধান্তকে আমি স্বাগত জানাই। সেজন্যই আমাদের নির্দলীয় প্ল্যাটফর্মের নাম; ‘আমরা ঢাকা’। এখানে কারো সঙ্গে বিরোধে গিয়ে নয়, সবাইকে বন্ধুত্ব-ভালোবাসা দিয়ে একত্রিত করতে চাই; যে মতেরই অনুসারী তারা হোন না কেন।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে আনিসুল হক বলেন, এটি নির্দলীয় নির্বাচন নি:সন্দেহে। কিন্তু সব নির্বাচনেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক দলের সমর্থন পরোক্ষভাবে থাকে। কারণ, এ নির্বাচনগুলোতে এত সমর্থকের প্রয়োজন হয়! সেখানে সম্পূর্ণভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানেরই সাহায্য না নিয়ে নির্বাচন করা মোটামুটি অসম্ভব। ঢাকা উত্তরে শুধুমাত্র পোলিং এজেন্ট হিসেবে ৬ থেকে ৭ হাজার কর্মী দুইদিনের জন্যে লাগতে পারে। তাদের সহযোগিতা করার জন্যে দুইদিনেই আরও ১০ হাজার কর্মী প্রয়োজন হবে। এর বাইরেও আরও ১০ হাজার কর্মীর প্রয়োজন হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন ছাড়া এতবড় কর্মীবাহিনী পাওয়া অসম্ভব।
বিভক্ত ঢাকার অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধান প্রসঙ্গে আনিসুল হক বলেন, দেখুন, ফিলিপাইনের ম্যানিলায় ১৭ জন মেয়র। প্যারিসে ১৩ জন মেয়র আছেন। তাদের কো-অর্ডিনেটিং একজন মেয়র থাকে। ঢাকা শহরে দুজন মেয়র থাকলে, আমি বিশ্বাস করি আসলে তা অলংঘনীয় কোনো সমস্যা নয়। এ দুজন মেয়র, ঢাকা শহরকে যারা বিভিন্ন সুবিধাদি দিয়ে থাকেন। তবে সমস্যাটি হলো; ৫৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজের সমন্বয় করা। আমরা বলি ৫৬ বাবার এক সন্তান। এটি অনেক বড় সমস্যা; কেউ ড্রেন বানান, তো কেউ কাটেন। কেউ রাস্তা বানান, কেউ কাটেন। কেউ গ্যাসের লাইন বানান, কেউ ওটা বন্ধ করে ওয়াসার লাইন বানান। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। যখন আসবে তখন আস্তে আস্তে দেখবো। এগুলো নিয়েই বাঁচতে হবে।
ডিসিসির সমস্যাগুলো নিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা শহরকে নিয়ে অনেক গবেষণাবিদ গত ৫০ বছর থেকে গবেষণা করছেন। আমরা ক’দিন আগে আমাদের এই প্ল্যাটফর্ম ‘আমরা ঢাকা’র পক্ষ থেকে তাদেরকে একটি সেমিনারে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তারা তাদের বহু বছরের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বেশ কিছু ধারণা আমাদের তৈরি হয়েছে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে আমরা সেমিনার করেছি, তাদের কথা শুনেছি। ‘আমরা ঢাকা’র ২০০ স্বেচ্ছাসেবক গত তিনদিন ধরে কাজ করছে। তারা প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে যাচ্ছে। একেক দিন ৯ থেকে ১০ হাজার মানুষের কথা শুনছে। তারা এলাকার প্রথম কয়েকটি সমস্যার কথা নোট করছে, এবং আমরা একটা ডাটাবেজ তৈরি করছি। এটা একটা দিক।
আরেকটা দিক হলো; আমরা আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতা থেকে জানি ঢাকা মৌলিক সমস্যাগুলো কি; অপরিচ্ছন্নতা। বর্জ্য। যানবাহনজট। স্কুলের সমস্যা। গ্যাস, পানি, লাইটের সমস্যা। একেক এলাকায় একেক রকম। পার্কের সমস্যা। মেয়েদের চলাচলের জন্য উপযুক্ত যানবাহনের সমস্যা। ছেলে-মেয়েদের জন্যে ভালো গণটয়লেট নেই। সেজন্য আমাদের স্লোগান হলো; সমস্যাগুলো চিহ্নিত; এবার সমাধানের পথে যাত্রা। আমার জন্যে যেহেতু এটি একদম একটি নতুন ক্ষেত্র। যেহেতু আমার অন্য অভিজ্ঞতা আছে। আমি মনে করি যে, এ দুটোর সম্মিলনে ৫ বছরে কিছু কাজ করা সম্ভব হবে। অগ্রাধিকার কোনটা? এটা বলতে গেলে অনেক কিছু বলতে পারবো। কিন্তু সারাংশে বলতে চাই, সমস্যাগুলো নিয়ে আমারা অনেক ভাবছি। আমাদের রিসার্চ টিম অনেক কাজ করছে।
আপনি একজন ব্যবসায়ী, নির্বাচিত হলে ব্যবসায়ীদের জন্য কী করবেন? জবাবে বলেন, এগুলো যা করছি তার সব সুফল ব্যবসায়ীরা পাবে। ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদা করে কাজ করার জন্যে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো আছে। আমার কাজ গরিব, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত- এদের জন্যে একটু ভালো থাকার ব্যবস্থা করা। উচ্চবিত্ত তো তার সমস্যা নিজেই সমাধান করতে পারে।
আনিসুল হক বলেন, তরুণ ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যে আমাদের আমাদের একটি ফেইসবুক ক্যাম্পেইন চলছে। যেখানে আমাদের একটি আইটেমের উপর একদিনে ১১ হাজার হিট হয়েছে। নাম; ‘আমরা ঢাকা’। আমরা একটি কল সেন্টার করেছি, সমস্ত মানুষের জন্যে। একটি অ্যাপস তৈরি করছি, সবার কথা শোনার জন্যে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছি। কারণ, তরুণরাই আগামী প্রজন্মের ঢাকা তৈরিতে সবচেয়ে বেশি কার্যকরি ভূমিকা রাখতে পারে।
‘বিরোধী জোটের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি এখনও পরিষ্কার নয়, এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?’—জানতে চাওয়া হলে জবাবে তিনি বলেন, এটি একটি নির্দলীয় প্ল্যাটফর্মের নির্বাচন। সবাই আসবেন এটুকুই আমার আমন্ত্রণ এবং প্রতাশা। আমরা সবাই মিলে প্রার্থী এবং ভোটার হিসেবে অংশগ্রহণ করি। কারণ ঢাকাকে আমি একটি ‘ঘর’ মনে করি। একটি পরিবার মনে করি। একটি পরিবারে যেমন মতভেদ থাকে, আবার সন্ধ্যার সময় সবাই এক হয়ে যায়। তেমনি রাজনীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ রাজনৈতিক কোলাহল আমরা গত ২০-২৫ বছর থেকে দেখে আসছি। সবকিছু নিয়ে তো বেঁচে থাকতে হবে। তো এই পরিবারটি গড়ি।
নির্বাচনের সময়ে নিরাপত্তা নিয়ে আনিসুল হক বলেন, আমি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে খুব শঙ্কিত নই। একপক্ষ আরেক পক্ষকে আক্রমণ করবে? দেখেন এখানে কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলই এই আক্রমণের সঙ্গে জড়িত নয় বলেই তারা বলছেন। সূতরাং যদি ভোট ঢাকাবাসী ঠিকমত চান, তাহলে তারা ভোট দিতে আসবেন। আর আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর দায়িত্ব হবে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
অন্য সিটিতে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের কারণ ও জয়ের কৌশল নিয়ে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সিটিতে কেন পরজিত হয়েছে, সরাসরি উত্তর আমি এভাবে দিতে পরবো না। সাধারণ মানুষ যদি মনে করেন যে, আমি তাদের উপকারে আসবো, আমাকে দিয়ে তাদের কাজ সম্ভব হবে, আমি ভালো প্রার্থী হতে পারবো তাহলে আমার বিনীত অনুরোধ থাকবে, তারা যেন আমাকে মেয়র পদে নির্বাচিত করেন। এতটুকু বলতে পারবো, সততার সঙ্গে সমস্ত স্বার্থের উর্দ্ধে উঠে ৫ বছর কাজ করার জন্যে মনস্থির করেছি। যেখানেই গেছি মোটামুটি কাজ করেছি। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই দায়িত্ব আমাকে দিলে আপ্রাণ চেষ্টা করবো।
‘জয়ের প্রশ্নে কতটুকু আশাবাদী?’- জবাবে আনিসুল হক বলেন, ‘জীবনে কখনো খুব একটা হারিনি। মায়ের দোয়া আছে। নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। এই সিদ্ধান্তটা সাধারণ মানুষ নেবেন। সূতরাং তাদেরই সাহায্য ও সহাননুভূতি কামনা করি। ’
বাংলাদেশ সময়: ০৯২৫ ঘণ্টা, মার্চ ২৩, ২০১৫

